আমি লীনাকে ভালোবেসে আকাশলীনা বলে ডাকি (ছোট) গল্প


আমি লীনাকে ভালোবেসে আকাশলীনা বলে ডাকি। ও একটু পাগলকিছিমের। একেকদিন একেক নামে আমাকে ডাকে। আগে ডাকতো বিড়াল বলে। ইদানিং গুড্ডি ডাকে। ভয়াবহ ঝগড়াটে আর জটিল মনের মানুষ সে। পেট ভর্তি তার শুধু প্যাঁচ। প্রেমের সময়টায় বলতো, বিড়াল শোনো- আমাকে বিয়ে করার পর তুমি শুধু সুখ আর সুউখ পাবে। আমি একটু কামুক হওয়ায় বিশেষ শব্দে টান দেয়া কথা শুনে গভীর রাতের পরিপাটি বিছানা আর তার মাঝখানে আধশোয়া হয়ে থাকা সুতাবিহীন দেবী লীনার পুরোটা শরীর কল্পনার ফ্রেমে এঁটে যেতো। ও তারপর দ্রুত ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে বলতো, মুখের অভিব্যক্তি এমন লম্পটের মতো হয়ে আছে কেন গো তোমার? নিশ্চয়ই ওসব দুষ্টুগোছের কিছু ভাবছো !

আমি শুনে বিষম খেতাম। তার দিকে তাকাতাম রাগ দৃষ্টিতে। সে কেমন করে যেন হেসে আমার নাকে মধ্যাঙ্গুলির টোকা দিয়ে বলতো, বোকা একটা ! তাকে নীল শাড়ির সাথে হাত ভর্তি লাল চুড়িতে লাগতো দারুণ। পটের বিবি হয়ে সবুজ ঘাসের উপর আঁচল বিছিয়ে বসে থাকতো। মনে মনে ভাবতাম, আশেপাশে ভিড় না লেগে যায়। যার চেহারা ভর্তি এতো মায়া, তাকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে না দেখে বেরসিকের মতো হেঁটে চলে যাবে কি করে কেউ !

প্রেম শুরুর দ্বিতীয় দিন সে আমাকে মুঠোফোনে একটা ছোট্ট চিঠি দিলো। আমি যত্ন করে সেটা এতোদিন রেখে দিয়েছিলাম। আজ আপনারদের প্রাসঙ্গিকভাবে সেটা শোনাতে ইচ্ছা করছে।

প্রিয় বিড়াল, আরামে ঘুমুচ্ছো নিশ্চয়ই। আমি কষ্ট করে করে রান্নাঘরে কাজ করছি। তোমার বাসা পাশে হলে তোমায় দিয়ে সবজি কাটাতাম কারণ আমি সবজি কাটতে পছন্দ করিনা একদম। হাতের নখ কালো হয়ে যায়।তোমার ঘুমে চলে আসতে পারলে ভালো হতো… আরো ঘুমাতাম। আর তোমার সাথে মিশে যেতে পারলে রান্না ছাড়াই পেট ভরে খেয়ে চলে আসতে পারতাম ! প্রকৃতি সকল শক্তি দেয়না মানুষের মাঝে। সেও চায়না, অতিপ্রাকৃত মাধুকরী কোন ঝড়ে সবকিছু সহজ হয়ে যাক এক দুঃখিনীর জন্য। ইয়াল্লা !! রান্না পুড়ে যাচ্ছে ! পরে লিখবো গো। শুভ সুন্দর মিষ্টি সকাল অপেক্ষা করছে। চোখ খোলো বদ। চুমুউ। ইতি
শুয়ে শুয়ে পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম, যে নারী এতো সুন্দর করে লিখতে পারে তার কাছ থেকে না জানি আরো কতো আঙ্গিকে প্রেম অপেক্ষা করে আছে ! আমার ভাবনাচিন্তা নিতান্তই মিছে ছিলোনা। ভালোবাসায় একটু ধাতস্থ হবার পর সে আমাকে দুহাত ভরে প্রেম দিতে লাগলো। আমি স্বার্থপরের পর নিতে লাগলাম যুবতী কন্যার উপচে পড়া বিশুদ্ধ সব অনুভূতি। ভালোবাসার আতিশয্যে আকাশটাকে রঙিন লাগতো খালি চোখে। এক গভীর রাতে সে আমাকে ফোন দিয়ে বললো, গুড্ডি… একটা দুঃখের গল্প শুনবে? আমি আমার আধময়লা মুঠোফোনটাকে লীনার ঠোঁট বানিয়ে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে বললাম, হু ! মিছেমিছি সে আমার বুকে মাথা রেখে গল্প শোনাতে লাগলো। আমি সত্য ভেবে তার চুল আঙ্গুলে পেচাতে লাগলাম।

“এক ছেলে তার মাকে নিয়ে যায় তীর্থে। সেখান থেকে কুড়িয়ে আনে একটি মেয়েকে। মেয়েটার সাথে ছেলেটার খুব ভালো সম্পর্ক। বন্ধু, সবচেয়ে প্রিয় কেউ। একদিন মেয়েটা ছেলেকে বললো তুমি বিয়ে করো। ছেলে বললো, তোর কষ্ট হবে। তোর জায়গায় অন্য কেউ বসবে, আদর নিয়ে যাবে, যখন খুশী তখন আমার ঘরে আসা যাবেনা। ঘুরতে যাওয়া যাবেনা। সব কিছুতেই ভাগ বসবে। কিন্তু মেয়েটির বায়না “বিয়ে করতেই হবে ! পরে বিয়ে করলো ছেলেটি অচেনা কারো সাথে এক জীবন কাটিয়ে দেবার জন্য।

যেদিন বিয়ে করলো, তার কিছুদিন যেতে না যেতেই মেয়েটি বুঝলো তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আর নাই। জিনিসটা বোধহয় আহ্লাদ করে শিকেয় তুলে রাখা সংসার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন তার পাগলামিতে জলে ভেসে হারিয়ে গেছে। তারপর একদিন মেয়েটা সকল গয়না শাড়ি নতুন বউকে দিয়ে দুরে চলে গেলো। এই দিকে ছেলেটিও মিশতে পারতোনা বউ এর সাথে। বউ জ্বরে একদিন মারা গেলো। কিন্তু ওই দুজনের আর মিল হলোনা কারণ তারা জানতো তাদের মধ্যে শুয়ে আছে অদৃশ্য সেই বউ !

আমি লীনার মুখে এমন অদ্ভুত গল্প শুনে গাল ফোলালাম। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তাকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলাম, তোমার জীবনের এমন সিরিয়াস একটা ঘটনা আগে শেয়ার করোনি কেন আমার সাথে? লীনা আমার কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো। ভৎসনা করে বললো, আরে গাধু… এটা রবীন্দ্রনাথের একটা ছোটগল্পের সারসংক্ষেপ। আমি নিজের মতো করে বললাম ! তোমার মতো কম জানা মূর্খকে বিয়ে করলে আমার জীবনে কি পরিণতি অপেক্ষা করে আছে, এবার তুমি বুঝতে পারছো তো?

রাত পেরিয়ে সূর্যের মুখ দেখি। আমার তবু অস্বস্তি ফুরোয়না। লীনা কেন আমাকে এমন অদ্ভুত একটা গল্প মাঝরাতে শোনালো? তবে কি সত্যিই এমন বেদনাবিধুর অতীত যত্ন করে তুলে রাখা আছে তার মনের সবচাইতে গোপন কুঠুরিতে ! একদিন শাহবাগের সাকুরায় বসে একটা বিয়ারের জায়গায় দুটো ডাবল সাইজের বিয়ারের ক্যান সাবাড় করে ফেললাম। ঘরে ফিরে লীনাকে ফোন দিয়ে শিশুর মতো মাতালের কান্না কাঁদলাম কিছুক্ষণ। লীনা ততোক্ষণে টের পেয়ে গেছে, আমি ছাইপাশ পেট ভরে খেয়ে এসেছি। চাঁছাছোলা ভাষায় বললো, তোরে আজকে আমি বিয়া ছাড়াই ডিভোর্স দিয়া দিবো খান্নাসের বাচ্চা। এমন একজন বোকাসোকা মাতালের সাথে আজন্ম সংসার করবার সাধ অন্তত এই লীনা বেগমের নেই !

তারপর একটু শান্ত হয়ে প্রশ্ন করলো, আমাকে কি একটু আগে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছিলে তুমি? আমি সাহস করে মনে সর্বদা খচখচ করা কথাটা তাকে আবারো বলে ফেললাম। কে সেই মহা হারামজাদা… নিজের সুখ বিসর্জনে তাকে বিয়ে করিয়ে তুমি বিবাগী হয়ে তারপর একদিন আমার মনে এসে নোঙ্গর ফেলেছো ! মাতাল অবস্থাতেও বুঝতে পারছিলাম, আমার ছোটলোকি প্রশ্ন শুনে মুঠোফোনের ওপাশে কি পরিমাণ রাগের উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বুদ্ধি করে তার মেজাজের উপর পাত্র ধরলে কেজিখানেক মুড়ি মুহূর্তেই ভাজা হয়ে যেতো !

লীনা তারপর বেশ কিছুদিন আর আমার সাথে কথা বলেনা। অবশ্য ওর দোষ নেই। সম্পর্কের শুরুতেই বলেছিলো, সে সরল টাইপ। তার নানা প্রকার দুষ্টুমি যেন সিরিয়াসলি না নিয়ে গহীনে যাবার চেষ্টা করে তাকে খুউব বোঝার চেষ্টা করি। এদিকে তার অভিমানে কথা বন্ধ করে দেয়া শাস্তিতে আমার শ্বাসকষ্টের মতো হতে লাগলো। আমি না খেয়ে শুকিয়ে কড়ই গাছের মরা কাঠ হয়ে যেতে লাগলাম। একদিন লাল শার্টে শাহবাগে ফুলের দোকানের পাশে হা করে একটা কুকুরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কুকুরটা মুগ্ধ হয়ে অনেকগুলো রজনীগন্ধার দিকে তাকিয়ে ছিলো। আমি এর আগে পুষ্পপ্রেমী কুকুর দেখিনি।

একটা সাদা গাড়ি বেশ কয়েকবার হর্ন দিলো পেছন থেকে। আমি বিরক্ত হয়ে কিছু একটা শোনাতে যাবো… তাকিয়ে দেখি পরিচিত গাড়ি। ভেতরে লীনা বসা। চোখে সানগ্লাস। মুখ অসম্ভব গম্ভীর। আঙ্গুল নাড়িয়ে এমনভাবে আমাকে ডাকছে যেন আমি হকারগোছের কেউ ! নিষিদ্ধ আকর্ষণে কিছুক্ষণের মাঝে গাড়িতে উঠে বসি। চার চাকার স্মার্ট যন্ত্র অদৃশ্য পাখা গুটিয়ে দ্রুতগতিতে যেতে থাকে আশুলিয়ার দিকে। ড্রাইভারকে দুই তিন সেকেন্ডের জন্য গাড়ি রানিং থাকা অবস্থায় চোখ বন্ধ করবার আদেশ দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট পুরে চুমু খায় সে।

তার কিছুক্ষণ পর চমকে দিয়ে বলে, রবীন্দ্রনাথের গল্পের সেই ঘটনাটা তোমার জীবনে ঘটেছিলো আশফাক। একটা বিয়ে করেছিলে তুমি। মিষ্টি দেখতে ছিলো সে। হেপাটাইটিস সি ছেনালি দ্রুততায় তাকে আকাশের ওপারে নিয়ে গেছে। আসল ঘটনা সেটা না। আসল ঘটনা, সেই বেচারির সাথে বিয়েতে ইন্সপায়ার করেছিলো তোমাকে মেঘলা নামে যে মেয়েটা… তাকে নিয়ে।

অসহায় মেয়েটাকে গ্রাম থেকে এনে তুমি শহরে ভালো কলেজে ভর্তি করিয়েছিলে। গভীর প্রণয় হয় তোমাদের। স্বর্গসুখে দিন কাটছিলো। কিন্তু নয়া বঁধুর মৃত্যুর কিছুদিন যেতে না যেতেই একদিন মাতাল অবস্থায় তোমার মস্তিষ্ক বিকৃতি প্রকাশ পেয়ে যায় মেঘলার কাছে। ঘোরের মাঝে বলে ফেলো, এর আগেও দু দুটো মেয়েকে মাতাল অবস্থায় ধর্ষণ করে কিভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে পার পার পেয়েছিলে তুমি ! অসহায় মেয়েটাকে খুন করে তারপর দীর্ঘদিন তুমি বাসার ডিপফ্রিজে লুকিয়ে রাখলে। তারপর…

পরশু আশুলিয়ায় এক বদ্ধ জায়গায় এতোদিনে সর্বশেষ ভিক্টিমের লাশের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমরা এখন সেখানেই যাচ্ছি। আর ভালো করে তাকান আমার দিকে হারামজাদা ! আমি হচ্ছি ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লীনা। ওই যে… পেছনে তাকালেই আমার গাড়ির পেছনে পুলিশের গাড়ি দেখতে পাবেন। ইই আর আন্ডার অ্যারেস্ট মি. পার্ভার্ট।


Like it? Share with your friends!

0

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমি লীনাকে ভালোবেসে আকাশলীনা বলে ডাকি (ছোট) গল্প

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles