এই গল্পের কি নাম দেবো !

বাপজান এর দৌড়ানি খেয়ে বাঁশ ঝাড় এর মধ্যে দিয়া কি যে একটা দৌড় দিছিলা। দৌড় দিতে যাইয়া ধাপুস করে গেলা পড়ে। লুঙ্গি রেখেই দিছো দৌড়। হি হি হি। হা হা হা তোমার জ্বালায় সে কথা


লিখাঃ মুরাদ ইমরান

নাও হা করো।

দেও। আজ তরকারি সেই হইচ্ছে। তোমার বয়স যত বারতাছে হাতের রান্নার স্বাদও বারতেছে। তোমার যে কথা। জ্বরের মুখেও পেট ভরে খাইছি। হুম নাও ওষুধটা খেয়ে নাও। আচ্ছা, তোমার কি ওই দিনের কথাটা মনে পড়ে? কোন কথা?

বাপজান এর দৌড়ানি খেয়ে বাঁশ ঝাড় এর মধ্যে দিয়া কি যে একটা দৌড় দিছিলা। দৌড় দিতে যাইয়া ধাপুস করে গেলা পড়ে। লুঙ্গি রেখেই দিছো দৌড়। হি হি হি। হা হা হা তোমার জ্বালায় সে কথা ভোলার কোন উপায় নাই। ইসসস রে! সে দিন যে কি ভয়টা পাইছি সারাজীবন মনে থাকবে।

আমার নাম মজনু। কৃষি কাজ করে জীবনযাপন করতাম। বছর দশ এক আগে দুইটা চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। তারপর থেকে এখন আর কাজ করতে পারি না। এই ছোট্ট টিনের ঘর আর ২ বিঘা ধানের জমি ছাড়া আমার কিছু নাই। ও হ্যে আছে। আমার বউ আছে। তবে কোন সয় সন্তান নাই। এতে অবশ্য কোন দুঃখ নাই। আল্লাহতালা সবাই কে সব কিছু দেন না। আমার দেখভাল আমার বউই করে। নিজে দেখতে পাইনা চোখে তাই তার যত্নআত্তি নিতে পারি না। এই বেপারটা আমর কাছে খুব লজ্জাজনক। অর্থের কিছুটা অভাব মাঝে মাঝে দেখা গেলেও দুই জনের সংসার তো তাই তেমন একটা কষ্ট হয় না।জ্বরটা কি কমছে? হও কিছুটা কমছে। শরীর এ পানি পরতেছে। হও, টিনের চাল কয়েক জায়গায় ফুঁটা হইয়া পানি পরতেছে। এবার বর্ষাটা যাক। দেখি কিছু করা যায় কি না। তুমি বসও। আমি হারিকেনটা ধরায়া নিয়া আসি।

দিনের আলো, হারিকেন এর আলো, রাতের অন্ধকার সবই আমার কাছে সমান। একটা হাত না থাকলেও চলা যায়। চোখ না থাকলে চলাফেরা করা খুব কষ্টের। পঁয়ত্রিশ বছরের এই সংসার জীবনে আমার ভাঙ্গা গড়া বলে তেমন কিছু নাই। তাই বলে যে সংসারে ঝগড়া বিবাদ নাই এইটা বলা যাবে না। আর দশটা সংসারের মত আমার সংসারেও হয়। তবে মান অভিমানটাই বেশি চলে। সন্তানাদি না থাকলে আনন্দ ফুরতি কিছুটা কম হলেও এখন সব সহ্য হয়ে গেছে। বউ বাজার এর ব্যাগটা দেও। আর আমার হাতের লাঠিটাও দিও।এই নাও। সাবধানে যাইও।

আমি অন্ধ বলে বউ কে বাজারে পাঠাবো এমন স্বামী আমি না। বাজারে হাজার মানুষ এর ভীর। এত মানুষের ভীরে বউ এর সাথে পর পুরুষ ধাক্কাধাক্কি করবে এইটা হইতে পারে না। গরীর মানুষ, তাই মানসম্মতই সব। ইজ্জত সম্মান নিয়া পরকালে যেতে পারলেই খুশি। পৃথিবীতে মানুষ এর মাঝে বিবেগ বলে এখনও কিছু আছে। তাই বাজার করতে গেলে আমাকে কেউ ঠকায় না। মাপেও কম দেয় না। মাঝে মাঝে পরিচিত কিছু দোকানদার দুষ্টামি করে বিশ টাকার নোট হাতে দিয়া বলে পঞ্চাশ টাকা দিছি। কিন্তু আমি ধরে ফেলতে পারি। তারা হেসে উঠে। সব কিছুই আমার মনের চোখ দিয়া দেখতে হয়। না দেখেও কোন উপায় নাই। বউ সাথে থেকে আর কত দেখায় দিবে।

আচ্ছা বউ, মানুষের সয় সন্তানাদি না থাকলে তার কষ্টের সীমা থাকে না। তোমার কষ্ট হয় না?আমি কিন্তু হাজার বার তোমারে মানা করছি এইসব বেপারে কথা না বলতে কথা বলবো না তো কি করবো? বোবা হয়ে বইসা থাকবো? আমি কথা কইতে না করি নাই। কিন্তু এই বেপারে কোন কথা শুনতে চাই না।

বউ পাকা অভিনেতা। তারা মুখের কথা শুনে বোঝার উপায় থাকেনা কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা। মিথ্যা বললে চেহারার মাঝে ফুঁটে উঠে। আমার চোখ না থাকায় দেখতেও পারি না। তাই বউ যা বলে সেইটাই সত্য মনে হয়। সারাদিন রাত দু’জন মিলে গল্প করি,খোচাখুচি করি। কথার পিষ্ঠে কথা বলি। আর অযথা মান অভিমান এর খেলা চলে। যেদটা বরাবরি আমি বেশি করি। বউ বড় ভাল। তাই সব মেনে নেয়। মাঝে মাঝে নিজের মনে হয় আজব এক মহিলা নিয়া সংসার করি। রাগঝাল তেমন নাই। কিছু বললে দাঁত বের করে হাসে। সারাদিন তার কান ঝালাপালা করাই আমার কাজ। তবে মাঝে মধ্যে খুব রেগে যায়। রেগে যেতেই পারে। মানুষ এর ধৈর্যের একটা সীমা আছে। তাই বউ রেগে গেলে আমি চুপ হয়ে যাই। বউ? হুম।  কি হইছে? শরীর খারাপ? হুম। কেমন লাগতেছে? খুব শীত করে। কোন কিছু ভাললাগে না। বমি হইলে ভাল লাগতো।

বউ এর শরীরটা আজকাল খুব খারাপ। সারা হাত পায়ে পানি চলে আসছে। আঙ্গুল দিয়ে শরীরে চাপ দিলে গর্তের মত হয়ে যায়। ঘনঘন টয়লেটে যাওয়া আসা করে। বেপারটা ভাল না। এই ভাবে থাকতে দেয়া যাবে না। কাল সকাল এ ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাব। এই বউ ছাড়া আমার পৃথিবীতে কেউ নাই। আর থাকলেই বা কি! বউ এর জায়গাটা বউ এর। আমার বাকি সময় গুলা না হয় বাদই দিলাম। অন্ধ হয়ে যাবার পরে চাইলেই পারতো আমাকে ফেলে চলে যাইতে। কিন্তু যায় নাই। বয়স কালে বেশ সুন্দরী ছিল। বছর দশ এক ধরে অন্ধ হওয়ায় এখন তার কি অবস্থা বলতে পারি না। প্রথম দেখায় তার প্রেমে পরছি। তার পর বিবাহ করার জন্য পাগল হয়ে গেছিলাম। আমার শ্বশুর কোন মতেই এ বিবাহে রাজি ছিলেন না। বহু কষ্টে তাকে রাজি করানো হইছিল। প্রেম করে বিবাহ করায় হয়ত ভালবাসাটা আজও রয়ে গেছে। তাই আজও এই অন্ধ মানুষটাকে নিজের কাছে রেখে দিছে। আমার হাজারও আবদার দিন এর পর দিন পূরন করে দিছে। মজনু কই গেছিলা? তোমার ভাবী’কে নিয়ে একটু ডাক্তার এর কাছে গেছিলাম। তার শরীরটা আজকাল ভাল না। তা ডাক্তার কি কয়? কিছু টেস্ট দিছে। করায়া আনা হইছে। আগামী সপ্তায় আবার যেতে হবে।

সপ্তা যেন শেষ হয় না। এদিকে বউ এর অবস্থা দিন দিন খারাপ এর দিকে। হাতে ধরে তাকে দিয়ে সব কিছু করানো লাগে। নিজের শক্তিতে কিছু করতে পারে না। সারা শরীর এ তার পানি এসে হাত মুখ ফুলে গেছে। আমি অন্ধ মানুষ। কোন কাজের যোগ্যতা রাখি না। নিজেরই চলতে কষ্ট হয় তার মাঝে বউ কে নিয়ে চলাটা খুব কষ্টের হয়ে গেলো। দিনের মধ্য হাজারটা কথা বলতো। এখন সারাদিন বিছানায় পরা। বউ! ও বউ হুম। কিছু খাবার এনে দেই? নাহ। তুমি আমার পাশে একটু বসও। আমি তো পাশেই বসা। তোমার কি খুব কষ্ট হইতেছে?

তোমারে একটা কথা বলি। যে দিন তোমারে প্রথম দেখছি কেন যেন তোমার সাথে সংসার করার খুব ইচ্ছা হইছিল। সে দিন থেকেই নিজেরে তোমার বউ ভাবতাম। একা একা হাসতাম। বাবাজান খুব রাগী মানুষ তাই তারে মুখ ফুঁটে কিছু বলা হইতো না। যখন শুনলাম এই বিবাহে তিনি রাজি না আমি সারারাত কাঁদছিলাম। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিছিলাম। তোমারে বড় বেশি ভালবেসে ফেলছিলাম। আজও ভালবাসি। অনেক ভালবাসি। আমিও তোমারে অনেক ভালবাসি বউ।

যখন তুমি অন্ধ হয়ে গেলা। আমারে অনেকেই বলছে তারে ছেড়ে চলে যাও। আমি যাই নাই। আজ তোমার জায়গায় আমিও অন্ধ হতে পারতাম। আমার সব সময় একটাই বিশ্বাস ছিল, আমি অন্ধ হইলে তুমি আমারে ছাইড়া যাই তা না। তাই আমিও তোমারে ছেড়ে যাই নাই। যে মানুষটারে এতোটা ভালবাসি। তারে ছেড়ে যাব কোথায়! আর গেলেও আমার দেহ যাবে, মন যাবে না।

কেনও যেন আজ আকাশটা খুব দেখতে ইচ্ছে হইতেছে। মনে হইতেছে আজ পূর্নিমা রাত। বউ এর কথায় চোখ চলে ভেসে গেছে। আমার চোখ অন্ধ হলেও মনের চোখটা কোন দিনও অন্ধ হয় নাই। শুধু পার্থক্য এইটাই বউ মুখে ভালবাসার কথা বলতে পারে আমি পারি না। আমি জানি। আমার মন জানে। আমি তারে কতটা ভালবাসি। জীবনের পঁয়তিশটা বছর তার সাথে কাটানো হইছে। তার ভাল মন্দ আমি দেখছি। তার মাঝে এমন কোন খারাপ কিছু পাই নাই যে কারনে তারে ঘৃণা করা যায়। আমি অন্ধ হয়েও তার উপর অনেক জোর আবদার করছি কিন্তু সে কখনও আমারে বুঝতে দেয় নাই আমি অন্ধ। আমার অন্ধত্ব নিয়া তার কোন অবহেলা ছিল না। রোগী আপনার কি হয়?জী আমার বউ।তাহলে আপনাকে কথা গুলো বলা যেতে পারে। আপনার বউ এর দু’টো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। যদি নতুন কোন কিডনি দেয়া না হয় তবে তাকে আর বাঁচানো যাবে না। যত তারাতারি সম্ভব কাজটা করতে হবে।

ইয়া আল্লাহ এ কি শোনাইছ তুমি আমাকে। জীবনে কি পেয়েছি আর কি পাই নাই তার কোনও হিসাব করি নাই কোন দিন। করার প্রয়োজনও হয় নাই। এই একটা মানুষরে নিয়া পরে আছি। তারেও নিয়ে যাবা। এ কেমন বিচার তোমার! দয়া করো খোদা। আমার এই পৃথিবীতে এই মানুষটা ছাড়া কেউ নাই। এতো বড় একটা দুনিয়া বানিয়েছ আমার এই দুনিয়ার দুনিয়াটা কেরে নিয়ও না। এই বউ ছাড়া আমার আর কেউ নাই আল্লাহ! রহমত কর, আমার এতো বড় সর্বনাশ তুমি করো না।

আমার কান্না শুনে হাসপাতালের সব ডাক্তার নার্স’রা ভীর করা শুরু করলো আর আমাকে সান্তনা দিলও। কিন্তু কারও সান্তনায় আমার মন ভরে না। বুকের মাঝে অন্ধ হওয়ার বিশাল কষ্ট ছিল। তবে আজ কষ্ট হইতেছে না এই ভেবে, বউ এর কষ্টের মুখটা দেখতে পারবো না। অন্ধ হয়ে ভাল হইছে তা না হলে বউ এর ওই মুখ দেখলে আমি হয়ত মরেই যেতাম।

বউ কে আর বাড়িতে আনা হয়নাই। তার অবস্থা খারাপ। তাই হাসপাতালে রেখে আসছি। আমি বাড়ি আসছি তার জামা কাপর গুলা গুছায়া নিতে। পাশের বাড়ির ভাবী বউ এর সব কিছু গুছায়া দিছেন। ব্যাগ এ করে রওনা হয়ে গেছি। জানি না কপালে কি আছে। বউ সারাদিন রাত কাঁদে। তারা সান্তনা দিতে পারি না। কারন নিজেকে সান্তনা দেয়ার মত কিছু নাই। বউ কে কি করে সান্তনা দিবও! মানুষ হিসেবে নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে হয়। এই জীবনটায় কিছুই করতে পারলাম না। ডাক্তার সাহেব বউ’টারে বাঁচানোর রাস্তা কি নাই? জী আছে। তাকে নতুন কিডনি দিলেই আশা করি তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কিডনি কয়টা লাগবে? দু’টো হলে ভাল হয়। একটা দিয়েও বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়া যায় তবে বেশি পরিশ্রম এর কাজ করা যাবে না আর কিছু নিয়ম মানতে হবে।

কিডনি কই পাওয়া যায়? দামটা বললে একটু খুশি হতাম। নিকট আত্মীয় থেকে কেউ দিলে ভাল হয়। এ ছাড়া অন্য কারটা হলেও চলে যদি সে বিক্রি করতে চায়। আর অপারেশন এর খরচ, হাসপাতালের খরচ তো আছেই। বেশ ভাল টাকাই লাগবে।

আমি অন্ধ একজন মানুষ। দুই বিঘা ধানের জমি চাষ করে সংসার চালিয়েছি। অন্ধ হওয়ার পর থেকে সংসারে অভাব আসলেও কারও কাছে হাত পাতি নাই। বেশ অনেক সময় না খেয়েও দিন পার করছি। কিন্তু ভিক্ষা করি নাই। অনেক এই বলছিলো বউ’টা এখনও জোয়ান আছে। কাজ এ পাঠায়া দাও। আমি তাও করি নাই। আল্লাহতালা গরীব বানায়া রাখছেন। তবে কারও কাছে মাথা নত করায়া রাখেন নাই। নিজের যা আছে তা দিয়েই বউ এর চিকিৎসা করবো। কারও কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে নিজের ভালবাসার মানুষরে তার কাছে ছোট করার ইচ্ছা আমার নাই। তাই ভাবছি জমি জমা সব বিক্রি করে দিব। ওই মানুষটাই আমার সব। সে বেঁচে না থাকলে আমার এগুলার কোন দরকার হবে না। নিজাম, আজও কেমন? আরে মজনু, কি খবর? ভাবীর অবস্থা কি?

তার অবস্থা ভাল না। মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ চলতেছে তার। নিজাম, তুমি আমার বাল্যবন্ধু। আমার একটা উপকার করতে হবে তোমার। আমি ধান এর জমিটা আর ভিটাবাড়ি দুই’টাই বিক্রি করে দিব। হাতে সময় খুব কম। যা করার তারাতারি করও।বাড়ি ঘর বিক্রি করে দিলে থাকবা কই?

হায়াত মোউত এর কথা বলা যায় না। যদি বউ বেঁচে না ফিরে তাহলে মসজিদ এর বারান্দায় থেকে বাকিটা জীবন পার করে দিব। ঈমাম সাহেব কে বলা হইছে। দিনের বেলায় বাহিরে থাকবো আর রাতের বেলায় ঝাড়ু দিয়ে বারান্দায় ঘুমিয়ে পরবো। এতে অবশ্য তিনি রাজী আছেন। আমার তো হাতে টাকা নাই। থাকলে আমি নিজেই কিনে রাখতাম। দেখি কি করা যায়।

অবশেষ এ সব কিছু বিক্রি করা হইছে। মানুষ বিপদে পরলে তার সুযোগ নেয়। তবে সব মানুষ না। কিছু মানুষ। সবাই জানে আমার এখন বিপদ। জরুরী ভাবে টাকা দরকার। তাই জমির দাম বলে বাজার দরের অর্ধেক। আমার কোন উপায় নাই। তাই বাধ্য হয়েই বিক্রি করতে হলোও। তবে এ নিয়ে মন এ কোন কষ্ট নাই আমার। টাকার পরিমানটা কম হয়ে গেছে এই আর কি। এই টাকায় কিডনি পাওয়া যাবে কি না কে জানে। বউ এর অবস্থা ভীষণ খারাপ এর দিকে। কখন কি হয়ে যায় বলা যায় না। তুমি আজকাল আমারে ভুলেই গেছও। কে বলছে এই কথা! কই আগের মত আমার আমার কাছে আর আসও না। আমি মরে যাব তাই আগের থেকেই দূরে সরায়া দিতেছো।

চুপ! খবরদার এমন কথা মুখে আনবি না। কোথায় যাবি তুই আমারে ছেড়ে। আমি তোরে কোথাও যেতে দিলে তো যাবি।একটা কথা কি জানও, তোমারে হারানোর ভয় কোন দিন পাই নাই। আমার শরীর এর কোন কষ্ট নাই। কষ্ট হয় এই ভেবে তোমারে ছেড়ে কবরে থাকবো কি করে! জীবন এ বুঝতে শিখার পর থেকেই তোমার সাথে। এতো তারাতারি তোমার কাছ থেকে চলে যাব এইটা ভাবি নাই কখনও।

চুপ কর! চুপ কর তুই! তোর আল্লাহর দোহাই লাগি। এমন কথা বলিস না। তুই ছাড়া তো আমার কেউ নাই রে বউ।নিজেরে বড় অপরাধী মনে হয়। তোমারে কিছুই দিয়ে যেতে পারলাম না। আজ যদি সন্তানাদি থাকতো তোমারে দেখে রাখতো। আমি চলে গেলে কে দেখবে তোমারে! পারলে আমারে মাফ করে দিও।

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বউ’রে বুকের মাঝে জরায়া ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলাম। এ কান্না যে পরম সুখের আর তৃপ্তির। জীবনে কোন দিন এমন সময় আসবে আমার তা চিন্তা ভাবনার বাহিরে ছিলও। সারাটা জীবন কাটছে আমি আর আমার বউ এ মাঝেই। বউ এর জীবনটাও ঠিক এমনিই কাটছে। দুই’জন যে দুই’জন এর থেকে কোন দিল আলাদা হতে পারি এমনটা কখনও কারও চিন্তা হয় নাই। আজ এমন এক দেয়াল হওয়ার অবস্থা আমি কেনও পৃথিবীর কোন শক্তি নাই এ দেয়াল ভাঙ্গার। একমাএ আল্লাহতালার ভরাস ছাড়া আর গতি নাই। ডাক্তার সাহেব, কিডনি কি পাওয়া গেছে?জী না। আমরা সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। কোথাও পাওয়া যায়নি এখনও। পাওয়া গেলই আমাদের জানানো হবে।

কিন্তু বউ এর অবস্থা তো ভাল না! তার চিকিৎসা দরকার। না পেলে কি করবো বলুন! আমরা তো চেষ্টা করছি। একটা কথা বলার ছিল। আমার তো দুইটা কিডনি। আপনে বলছেন একটা হলেই চলবে। তাহলে একটা কাজ করলে কেমন হয়? আমার একটা কিডনি বউ’রে দিলাম আর একটা দিয়ে আমি বেঁচে থাকলাম!

হ্যে তা করা যায়। তবে আগে দেখতে হবে আপনার কিডনির সাথে তারটা মিলে কি না।আরও কিছু বেপার আছে। যদি সব ঠিক থাকে তবে আপনারটা নেয়া যেতে পারে ডাক্তার সাহেব, আপনি আমার ছেলে সমতুল্য। তাই বলতে ভীষন লজ্জা হইতেছে। কি করে যে বলি! লজ্জার কিছু নাই। আপনি বলুন।

মানে হইলো কি! এই মানে আমার বউ আর কি! আমার বউ, বুঝছেন তো না! আমার বউ আমারে খুব ভালবাসে। সে যদি জানতে পারে আমি কিডনি দিছি তাহলে সে নিবে না। বেপারটা সম্পূর্ণ গোপন করতে হবে তার কাছে। আমি বাবা’র বয়সী হয়ে আপনার হাতে ধরি। আপনি আমার কিডনিটা নেন। আমার বউ’টারে বাঁচান। আমার বউ ছাড়া আমার কেউ নাই রে বাপ। বউটারে যে অনেক ভালবাসি। আপনে আমার এতোটুকু উপকার করেন। আমি সারা জীবন আপনার কাছে ঋণী থাকবো। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। চলেন আগে টেস্ট করে দেখি। যদি সব ঠিক থাকে তবে নিতে আমাদের কোন সমস্যা নাই।

আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার কিডনি বউ’কে দেবার ব্যবস্থা হইতেছে। পাশাপাশি দুইটা বিছানায় আমরা শুয়ে আছি। বউ কে আগে অজ্ঞান হইছে যাতে বউ আমাকে দেখতে না পারে। জানি না অপারেশন এর পর বেঁচে ফিরবো না মরে যাব। বউ টাকে শেষ বারের মত দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। অন্ধ হওয়ার আর দেখা হলো না। তবে তার মুখটায় হাত বু্লিয়ে দিছি। কেন জানি চোখ দিয়ে আজকাল খুব পানি পরে। কোন ভাবেই ধরে রাখতে পারি না। ঈমাম সাহেব কে বলা হইছে তিনি যেনও মসজিদ এ মিলাদ এর ব্যবস্থা করেন আসরবাদ। অজ্ঞান হওয়ার ইনজেকশন দেয়া হইছে আমাকে। কিছুখন এর মধ্যেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাবও। ইয়া আল্লাহ! সহিসালামত এ আমাদের দুই’জন কেই ফিরায়া আইনো।

সব কিছু ঠিকঠাক মতই হইছে। বউ এখন বেশ সুস্থ। কিন্তু আমার হইছে সমস্যা। কোমর এর ওখানে অপারেশন তো হইছেই চোখের মধ্যেও হইছে। বেপারটা বুঝতে পারতেছি না কিছুই। ডাক্তারদের জিজ্ঞেস করলে বলে আমি না কি অসুস্থ ছিলাম তাই আমার দুই জাগায় অপারেশন করা হইছে।বউ? কি? আমার তো দুই জায়গায় ব্যান্ডেজ। তোমারও কি একি অবস্থা? হি হি হি। আজব তো! হাসির কি হইছে? আর কয়টা দিন পর নিজেই জানতে পারবা।

বউ এর হাসিতে মাঝে মাঝেই শরীর জ্বলে উঠে। কিছু বলা হইলেই তার হাসি শুরু হয়ে যায়। এতো হাসে দেখেই তো কপালে এতো দুঃখ। বার বার বলা হইছে এতো বেশি হাইসো না। কে শোনে কার কথা। আজ আমার চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হইতেছে। জানা যাবে ঘটনাটা কি! আমি আসতে আসতে চোখ খোলার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পর তাকায়া দেখে আমার চোখে আলো ফুঁটছে। বউ এর দিকে তাকাতেই দেখি বউ এর চোখে ব্যান্ডেজ করা।এই বউ এই! তোমার চোখে কি হইছে। কিছু হয় নাই। তুমি শান্ত হও। শান্ত হবো মানে! এই তোমার কি হইছে। বউ তোমার চোখে কি হইছে।

বউ আমার বুকের ভিতরে মাথাটা রেখে আমাকে জরায়া ধরে চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করে দিছে। আমার আর বুঝতে বাকি নাই বউ এর চোখ দুইটাই আমার চোখে। আমি যেমন ওর কাছে লুকায়া আমার একটা কিডনি দিয়ে দিছি ঠিক তেমনি বউ আমার কাছে লুকায়া তার চোখ দুইটা আমার দিয়ে দিছে। বউ বলেন আর মা বলেন এরা হলো নারী জাত। এরা আগে থেকেই সব টের পেয়ে যায়। এদের কাছ থেকে কিছুই লুকানো যায় না। তুই এমন একটা কাজ কেন করলি! বল আমারে কেন করলি তুই? তুমি শান্ত হও। তোমার পায়ে ধরি! তুমি শান্ত হও। আমি হাসপাতালের সব ভেঙ্গে ফেলবো। তুই কেন এমন করলি বউ! কেন, কেন এমন করলি। তোমার আল্লাহর দোহাই! তুমি শান্ত হও। আমার কথা একটু শোনও। তারপর তোমার যা খুশি কইরো। আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তুই কেন এমন কাজ করলি বল আমারে।

আমার শেষ ইচ্ছা আমি যে দিন মারা যাব। তুমি নিজ হাতে আমারে কবরে শুয়াইয়া দিবা। তুমি চোখে না দেখলে কেমনে করবা কও? আমি না তোমার চোখে অনেক সুন্দর। আমার এতো সুন্দর হইয়া লাভ কি যদি তুমি দেখতেই না পারলা। দশ টা বছর ধরে তুমি অন্ধ হইয়া ছিলা। আজ থেকে তুমি আমারে দেখবা।

আমি আর আমার বউ যে শুধু কাঁদতে ছিলাম তা কিন্তু না। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, সব রোগীরা আমাদের এমন ভালবাসা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারে নাই। কারও পক্ষে কি সম্ভব ধরে রাখা। হয়ত সম্ভব না!
হাসপাতালের সব টাকা পরিশোধ করতে পারি নাই। কিছু টাকা কম পরে গেছিলো। তবে তারা অনেক ভাল মানুষ। বাকি টাকা দিতে হবে না বলে জানানো হইছে আমাকে। কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে বউ কে হাতে ধরে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেলাম। মাথার ভীতরে দুনিয়ার চিন্তা এখন। আজ থেকে বউ এর সব দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু যাব কোথায়! বাড়ি ঘর যা ছিলো সব বিক্রি করে দিছি। হাতে কাপড় এর এই ব্যাগ আর পকেট এ খুচরা কিছু টাকা ছাড়া আর কিছু নাই। চারপাশএ শহরের ছয়তলা সাততলা বড় বড় বাড়ি ঘর। ভয়ই লাগে নিজ দিয়ে হাঁটতে। কখন না জানি মাথার উপর ভেঙ্গে পরে। কি হইলো তোমার! চুপ হয়ে আছে কেন?দেখছো বউ, কত বড় বড় ছয়তলা সাততলা বাড়ি ঘর! কথাটা শুনে বউ হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেলো। আমার সামনা সামনি এসে গাল এর মাঝে হাত রাখলো। পুরোটা মুখে হাত বুলায়া দিলো। রাস্তায় এতো এতো মানুষ। কয়েক জন বাকা চোখে তাকাছে। বউ এমন করতেছে কেন বুঝে উঠতে পারতেছি না। বেপারটা বেশ লজ্জার। মাঝ বয়সী দু’জন মানুষ রাস্তার মাঝে এভাবে দাঁড়ায় থাকবে এইটা ঠিক না। কিছু বলবা বউ?

ভালবাসা কি ছয়তলা সাততলার উপরে থাকে! থাকে না। ভালবাসা মাটিতে হাঁইটা বেড়ায়।

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই গল্পের কি নাম দেবো !

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles