একজন ওসমান স্যার


কামরুল নাজিম : 

১.

একটা বিশাল পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছি। আমার বুকের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাহাড়। সেই পাহাড়ের চূড়ায় হাসাহাসি, আনন্দ আড্ডা আর বিনোদনের পসরা। আমি কি পৌঁছাতে পারবো সেই আনন্দযজ্ঞে? হয়তো পারবো! তবে সময় লাগবে আমার। অনেক সময়!!

 

একটা ক্লাস থ্রি পড়ুয়া বাচ্ছার গল্প বলি। সে সকালে ঘুম থেকে উঠে আরবী পড়তে যেত। সেখান থেকে এসে কিছুটা সময় এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে ঠিক সাড়ে নয়টায় কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে বাড়ির অদূরে জসাইপাড়া স্কুলে পড়তে যেত। তবে সেটা তার স্কুল নয়। সে পড়তো অন্য স্কুলে। সে মূলত এই স্কুলে যেত প্রাইভেট পড়তে। হয়তো ঠিক প্রাইভেটও নয়। একজন স্যার তাকে অফিসে বসিয়ে বিভিন্ন পড়া দেখিয়ে দিত আর সে পড়তো। ঘড়ির কাঁটা  বারোটা স্পর্শ করলে সে ফিরতো সেই স্কুল থেকে। কারন, দুপুর একটা থেকে তার স্কুলে ক্লাস শুরু।

 

সেই জসাইপাড়া স্কুলে যাওয়ার পথে একটা বড় পোল পাড়ি দিতে হত ক্লাস থ্রির বাচ্ছাটিকে। তার নিচে অনেক বড় খাল। আর সেই বর্ষায় পোলটি ভেঙ্গে যাওয়ায় গ্রামবাসী তার উপর বাঁশের সাঁকো তৈরী করেছিলেন। স্কুল যেতে হলে সাঁকো পাড়ি দিতে হবে।

সেদিন সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। যার ফলে পিচ্ছিল সাঁকো পাড়ি দেয়ার সময় পা পিছলে খালের জলে পড়ে যায় বাচ্ছাটি। সাঁতার না জানা ক্লাস থ্রির বাচ্ছা! মৃত্যুর মুখে পতিত হল সেদিন।

বাচ্ছাটির পিছন পিছন সাইকেল চালিয়ে আসছিলেন একজন মানুষ, একজন দেবদূত! যিনি খুব খেয়াল রাখছিলেন বাচ্ছাটির উপর। যিনি নিজের হাতের কাছে রেখে বাচ্ছাটিকে তিল তিল করে গড়ে তুলতে লাগলেন।

সেই তিনি যখন খেয়াল করলেন সাঁকোর উপরে বাচ্ছাটি আর নেই; তিনি আর দেরী করলেন না। রাস্তার পাশে সাইকেলটি ফেলে রেখে প্যান্ট শার্ট পড়া সেই স্কুল মাস্টার সোজা ঝাঁপিয়ে পড়লেন খালের জলে। তারপর টেনে তুলে আনলেন বাচ্ছাটিকে। শুধু যে তুললেন তা নয়, একেবারে বাড়িতে এনে দিয়ে গেলেন। আর বলে গেলেন, পোল এটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ওকে আর ওদিকে পাঠাবেন না স্যার। স্যার বলতে তিনি বাচ্ছাটির বাবাকে সম্বোধন করেছিলেন।

 

সেই যে ওসমান স্যার আমার হাত ধরলেন! এত শক্ত করেই ধরলেন যে, এসএসসি পর্যন্ত আর ছাড়েন নি সেই হাত। আমাকে যে কেবলই খালের জল থেকে টেনে তুললেন তা নয়, একটা মফস্বলের অনেক অজানা আতঙ্ক, ভয় আর অনিশ্চয়তা থেকে তুলে আনলেন। আমাকে তিনি নিজ হাতে গড়েছেন পরম যত্নে আর ভালোবাসায়। আমার অনেকটা জুড়ে আছেন স্যার। আমার শৈশব আর কৈশোরের দুই গল্পেই স্যার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছেন।

 

২.

ওসমান স্যার মূলত নাম করেছেন অ্যাকাউন্টিংয়ের টিচার হিসেবে। তারচেয়ে ভালো করে হিসাব বিজ্ঞান আর কে ঢুকিয়ে দিতে পারতো শিক্ষার্থীর মাথায়? অথচ স্যার, ম্যাথ, ইংরেজিটাও খারাপ পড়াতেন না। কিন্তু তিনি পরিচিতি পেয়ে গেলেন হিসাব বিজ্ঞানের বস শিক্ষক হিসেবে। সন্দ্বীপের ওই ছেলেগুলোর জন্য আমার খুব আপসোস হয়, যারা কমার্সে পড়েছে কিন্তু ওসমান স্যারের কাছে পড়ে নি। ওসমান স্যারের কাছে পড়া লাস্ট বেঞ্চের ছাত্রটাও অনেক ভালো হিসাব বিজ্ঞান বুঝিয়ে দিতে পারবে প্রতিষ্ঠিত অনেক হিসাব বিজ্ঞানের স্যারের চাইতে। এটা জোর দিয়ে বলা যায়। এবং হ্যাঁ, জোর দিয়েই বলছি।

 

ওসমান স্যারের একটা আলাদা স্বকীয়তা ছিল। তিনি পড়াতেন না। তিনি গল্প করতেন। গল্প করতে করতে তিনি পড়াটা ঢুকিয়ে দিতেন স্টুডেন্টদের মাথায়। যেখানে অনেক স্টুডেন্ট শুধুমাত্র অঙ্কের ভয়ে আর্টস নিয়ে পড়তো সেখানে ওসমান স্যার কি ফানি সাব্জেক্ট হিসেবে হিসাব বিজ্ঞানকে উপস্থাপন করতেন। অনেক দূর দূরান্ত থেকে স্যারের কাছে ছাত্ররা পড়তে আসতো। দুইটা হাউজে (টিউটিরিয়াল হোম) স্যার অন্তত সাতটা স্কুলের স্টুডেন্টদের পড়াতেন দুটো ব্যাচ করে।

 

স্যারের পড়ানোর ঢঙটা আলাদা ছিল। তার পড়ানোর মাঝে রসবোধ ছিল, যেটা স্টুডেন্টদের জাগাতে পারতো। খুব অবলীলায় স্যার ঢুকে যেতে পারতেন স্টুডেন্টের মনের গহীনে। কি অঝোর বর্ষণমুখর দিন! কিংবা উত্তরের কনকনে হিমেল বাতাসে কি হীম শীতের সকাল! অথচ, স্যারের স্টুডেন্টরা সবাই হাজির। স্যারের প্রাইভেটে একদিন না আসা মানে যে অনেক কিছু মিস হয়ে যাওয়া। স্যারের কথা বলার স্টাইলটা ছিল মোহনীয়। অনেক দূরের স্টুডেন্টকেও তিনি নিমিষে কাছে টেনে আনতে পারতেন। ওসমান স্যার এমনই একজন ভালোবাসার স্যার। এমনই একজন পরম বন্ধু প্রতিটি ছাত্রের।

 

স্যারের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল গত জানুয়ারীতে। আব্দুল মান্নান মার্কেটের সামনে। আমি ছিলাম, Mohin Ahmmed Robin ছিল, Nazmul Razu ভাই ছিলেন। রঙ পেন্সিলের বিজ্ঞান বিকাশ প্রোগ্রামের দাওয়াত দিয়েছিলাম। এই শেষ দেখা! কখনো ভাবতে পারি নি। কল্পনাও করি নি।

গত কোরবানির ঈদে একদিন সন্ধ্যায় স্যারের দেখা পায় কমপ্লেক্সে। স্যারের সাথে তিনঘন্টা আড্ডা দিয়েছিলাম সেদিন। আমি, Abu Hamid Shamim, Mahin Shahriar Akib, Abu Ryhan Taninও ছিল। স্যার যেখানেই দাঁড়াতেন, একটা জটলা হত। স্যারের স্টুডেন্টরা এসে ঘিরে ধরতো স্যারকে। কত স্টুডেন্ট স্যারের!!

উপজেলা কমপ্লেক্স কিংবা এর আশে পাশে এখন অনেকেই হিসাব বিজ্ঞান পড়ান। আর বলা যায় তারা সবাই স্যারের স্টুডেন্ট। একদিন স্যারকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলাম। স্যার হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা কামরুল, তোর কি মনে হয় না এটা আমার জন্য খুবই গর্বের যে, আমার স্টুডেন্ট এখন আমাকে টেক্কা দিচ্ছে।’ আমি শুধু স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটা মানুষকে আর কতভাবে ভালোবাসা যায়!!

 

৩.

সেদিন সন্ধ্যায় যখন শুনলাম লালবোট ডুবে গেছে,  প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দিই নাই। কিন্তু ধীরে ধীরে গুরুত্ব দিতে লাগলাম। পরবর্তীতে যখন শুনলাম ওসমান স্যার নিখোঁজ। হৃৎপিন্ডটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। তারপর থেকেই অপেক্ষার শুরু। এইতো শুনবো ওসমান স্যারকে পাওয়া গেছে। এবং একবার শুনেও ছিলাম। মনটা খুব শান্ত হল। এর আধঘন্টা পরে আবার শুনলাম, স্যারকে পাওয়া যায় নি। আগেরটা ছিল মিথ্যা নিউজ। আবার উৎকন্ঠা! তবে আশায় ছিলাম, স্যারকে পাওয়া যাবে। স্যার ঠিক ফিরে আসবেন। এভাবেই কাটে একটি নির্ঘুম রাত।

পরদিন সকালে আব্বাকে কল দিলাম। বলে নিই আমার এই তেইশ বছরের জীবনে আমি কোনদিন আমার আব্বাকে কাঁদতে দেখি নি। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, স্যারের কোন খবর পাওয়া গেছে কিনা? আব্বা বললেন, ওসমানের তো কোন,,,,! আব্বা বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। আব্বার কণ্ঠ কাঁপছিলো। স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম নিজের ছাত্রের জন্য আব্বা কাঁদছেন। স্যার আমার আব্বার ছাত্র ছিলেন, আমি স্যারের ছাত্র ছিলাম। গর্বিত ছাত্র!!

 

প্রতিটি মুহুর্তে মনে হয়েছে স্যার বেঁচে আছেন। স্যার ফিরে আসবেন। উড়িরচরে স্যারের ব্যাগ পাওয়া গেল। তখনও মনে হচ্ছিল স্যার আছেন। স্যার ফিরবেন সেই চিরচেনা হাসিমুখে। স্যারের স্টুডেন্টরা অপেক্ষায় আছে। যাদের এইচএসসি চলতেছে, স্যার নিশ্চয় তাদের বলেছেন, হিসাব বিজ্ঞানের বন্ধের সময়গুলতে পড়তে আসতে। শেষবারের মত স্যার আবার একটু বুঝিয়ে দিবেন সবকিছু। এখন তাদের কে বুঝিয়ে দিবে হঠাৎ বুঝতে না পারা জটিল এন্টিগুলো??

 

গতকাল বিকেলে যখন শুনলাম স্যারের লাশ পাওয়া গেছে, আমি তখন পড়াচ্ছিলাম। আমার নবম শ্রেণীর স্টুডেন্টকে আমি রেওয়ামিল বুঝাচ্ছিলাম। আর আমার স্টুডেন্ট অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করলো আমি কাঁদছি। তার খাতায় টপ টপ করে জল পড়ছে।

স্যারের জন্য আমি আর একবার কেঁদেছি, যখন দেখলাম সাদা কাফনে মোড়া স্যারের নিথর দেহ জানাজা শেষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রথম আমার মনে হল, স্যার চলে যাচ্ছেন। আর কখনো স্যারের সাথে দেখা হবে না। আর কখনো কথা হবে না!! আমার বুক ফেটে কান্না আসলো। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন  আবার সবকিছু ঝাপসা দেখছি কেন?

 

 

৪.

স্যার, আপনি ছিলেন একটা কাঠামোবদ্ধ কবিতা। যার প্রতিটি ছত্রে লুকায়িত ছিল ভালোবাসা। এবং পরম আনন্দে স্টুডেন্টরা আপনাকে পড়েছে।

স্যার, আপনি ছিলেন একটা উপভোগ্য উপন্যাসের নিখুঁত কারিগর। যিনি পরবর্তীতে কোলাহলপূর্ণ জনপদকে স্তব্দ করে দিয়ে টেনে দিলেন ট্র‍্যাজিক উপসংহার।

 

জীবন রেওয়ামিলে আপনি দু’দিন অনিশ্চিত হিসাব ছিলেন স্যার। আমরা হিসাব মেলাতে পারছিলাম না। তবুও আশাবাদী ছিলাম। স্যার, এত নির্মমভাবে আপনি হিসাব মিলিয়ে দিলেন কেন?? জন্মের দায় এত সকালে শোধ হয়ে গেল কেন স্যার? সেটি অনাদায়ী থাকতো আরো কয়েক যুগ। কি হতো স্যার?? কি হতো??  রেওয়ামিল অমিল থাকতো!!

সব রেওয়ামিল মিলিয়ে দিতে হবে কেন??

 

আজ থেকে পনের বছর আগে খালের জল থেকে আপনি আমাকে টেনে তুলেছিলেন স্যার। আজ আপনিও পড়ে থাকলেন এমনই একটি খালে। আমিই কিছুই করতে পারি নি। এই অকৃতজ্ঞতার জন্য ক্ষমা করবেন স্যার।

ওপাড়ে আপনি ভালো থাকবেন স্যার!! অনেক ভালো থাকবেন।

 

(৫.

ওসমান স্যার মারা গেছেন!! রসিকতা করবেন না দয়াকরে। এই স্বল্প জীবনে তিনি কম করে হলেও ত্রিশ হাজার স্টুডেন্টের গর্বিত শিক্ষক!!)


Like it? Share with your friends!

0

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একজন ওসমান স্যার

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles