একজন করিম আলি

আজ সকাল বেলা করিম আলির ভাগ্য মনে হয় ভালো। হঠাৎ এক ভদ্র মহিলা এসে করিম আলিকে জড়িয়ে ধরলো। বাবা বাবা বলে ডাকতে লাগলো। করিম আলি সব সময় চুপচাপ থাকে। তাকে কেউ কখনো কথা বলত


মঈনুদ্দীন শামীম :  বৃদ্ধ করিম আলি। রেল স্টেশনের ধারে রাস্তার পাশে সে ভিক্ষা করছে। দীর্ঘদিন এই জায়গাটাতেই সে ঘুরে ফিরে ভিক্ষা করে। দুচার টাকা যা পায় তাতেই তার চলে। স্টেশনের ছাউনিই এখন তার ঘরবাড়ি। এক সময় বাড়ি-ঘর চাষবাসের জায়গা জমি সবই ছিল। দারুণ ঝড় জলোচ্ছ্বাস আর মেঘনার প্রবল ভাঙ্গন তার আপনজনসহ ধন সম্পদ সবই কেঁড়ে নেয়। দিনের পর দিন অনাহারে অর্ধাহারে থেকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে সে ভিক্ষা করতো। আজ বেশ কিছু দিন যাবত এ জায়গাটা থেকে সে আর নড়েনা। নির্বাক দৃষ্টিতে টিনের থালা হাতে এখানে বসে থাকে সে। চেহারায় আভিজাত্যের চাপ। আশপাশের লোকজনের কাছে তার চেহারা চেনাজানা। সবাই তাকে এখানে বসে থাকতে দেখে। এমন সুন্দর শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ লোকটিকে ভিক্ষে করতে দেখে সবাই আশ্চর্যের দৃষ্টিতে তাকায়। চলার পথে কেউ দুচার টাকা দেয়, কেউ বা এড়িয়ে যায়।

আজ সকাল বেলা করিম আলির ভাগ্য মনে হয় ভালো। হঠাৎ এক ভদ্র মহিলা এসে করিম আলিকে জড়িয়ে ধরলো। বাবা বাবা বলে ডাকতে লাগলো। করিম আলি সব সময় চুপচাপ থাকে। তাকে কেউ কখনো কথা বলতে দেখেনি। আজ এ মহিলার বাবা ডাকে সে বিরক্ত। সে বলে
 আমি রাস্তার ফহির, আপনে ক্যান আমাকে বাবা ডাকতাছেন?
 না, আপনি ঠিক আমার বাবার মত। এই যে কি সুন্দর দাড়ি, ঠিক আমার বাবার মত, কি সুন্দর চোখ, নাক, চেহারার গঠন – সবই ঠিক আমার বাবার মত।
: না না, এগুলো কি বলতাছেন? আমার কেহ নাই, আমি হইতাছি রাস্তার ফহির।
এসময় এক ভদ্রলোক বলে উঠলো—
 আরে আপনি মনে হয় সাধু বাবা। ঠিক আমার শ্বশুর আব্বার মত। গত বছর মারা গেছেন। এখন আমার ছোট শ্যালিকার বিয়ের বাজার করতে এসেছি। তাই আমার স্ত্রী আপনাকে দেখে তার বাবার কথা মনে পড়েছে। আপনি দেখতে ঠিক তার বাবার মত। একটু আসেন না আমাদের সাথে। আপনাকে নতুন জামা কাপড় দেবো।
না না আমার এসব লাগবোনা, আমি হইছি ফহির, নতুন জামা দিয়ে কি করুম।
অনেক লোকজনের জটলা বেঁধে গেছে। সবাই তাকে বলছে
 যাওনা ওদের সাথে। ওরা যখন এতো করে বলছে।
 চাচা মিয়া, যান আপনের ভাইগ্য খুইলা গেছে, আর ভিক্ষা করন লাগবোনা, যান যান 

করিম আলি না পেরে উঠে অবশেষে ওদের সাথে একটা রিকশা চেপে বসলো। কিন্তু মুখে কোন কথা নেই একেবারে নির্বাক।

এই মহিলা ও তার স্বামী মিলে করিম আলিকে পোশাকের দোকানে নিয়ে গেল। জুতোর দোকানে নিয়ে গেল। তার সাইজ অনুযায়ী পাঞ্জাবি পায়জামা জুতো মুজো কিনে দিলো। তারপর পাশের পুকুর ঘাটে নিয়ে উক্ত মহিলা নিজ হাতে হাত মুখ পা ধুইয়ে পরিষ্কার করে নতুন জামা কাপড় আর জুতো মুজো পরালো। রেস্তোরায় নিয়ে ডিম পরাটা খাওয়াল। করিম কোন কথা বলেনা। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকটি তাকে বার বার বাবা বাবা ডাকছে। সে মনে মনে ভীষণ খুশি।

গায়ে হলুদের জিনিসপত্রসহ বিয়ে বাড়ির যাবতীয় কাপড় চোপড় কেনা কাটা শেষ। এখন বাকি শুধু জুয়েলারি সামগ্রী। সব বাজার খরচসহ তাঁরা করিম আলিকে নিয়ে জুয়েলারি মার্কেটে ঢুকলো। এ দোকান ও দোকান ঘুরে ঘুরে তারা নানা ডিজাইন ও দাম পরখ করছে। নাকফুল, হাতের আঙ্গুলের আংটিসহ ছোট খাট জুয়েলারিও কেনা হয়েছে, এখন গলার ভারি চেইন, হাতের বালা তার মাথার তাজ বা টিকলি বাকি। কিন্তু এ সবের সমন্বিত ডিজাইন কোথাও তাদের পছন্দ হচ্ছেনা। প্রতিটা দোকানে বারবার ঘুরেফিরেও পছন্দ করতে পারছেনা। খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লো। অবশেষে তাদের দুটো সেট মোটামুটি পছন্দ হয়েছে কিন্তু কোন সেটটি নিবে সেটা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা। এ দিকে বেলাও প্রায় ১১টা বেজে গেল। হঠাৎ তাদের মাথায় বুদ্ধি এলো। তারা দোকানিকে বললো, এ দুটো সেট থেকে তারা কোনটি নিবে বাসায় গিয়ে কনের পছন্দ জেনে দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবে। ততক্ষণ বাবা বাজার খরচসহ এখানে থাকবে। যাওয়ার সময় তারা তাদের বাবা ও দোকানিকে বারবার বলেছে যে এ দুটো সেট থেকে কোনটি কনের পছন্দ তা জেনে সাথে সাথেই ফিরে আসবে। দোকানি ঠিক আছে বলে তাদের বাবার জন্য কোক পানিয়র অর্ডার দিল। করিম আলি বসে বসে কোকাকোলা পান করছে আর তার মেয়ে এবং মেয়ের জামাই জুয়েলারি সেট নিয়ে বাসায় গেল।

দশ মিনিট শেষ হলো, ত্রিশ মিনিটও শেষ হলো, তারা কিন্তু তখনো এলোনা। একঘণ্টা হয়ে গেলে জুয়েলারি দোকানি করিম আলিকে জিজ্ঞেস করলো যে তার ছেলে মেয়ে দুটো কোথায়? আসেনা কেন? বাসা কোথায়? কি হয়েছে? কিন্তু করিম আলি নির্বাক, কোন কথা বলেনা। দোকানি আরও একঘণ্টা অপেক্ষা করলো। অবশেষে জুয়েলারি দোকানির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। দোকানির লোকজন করিম আলিকে চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। করিম আলি বললো, সে একজন ভিক্ষুক এবং সে এসবের কিছুই জানেনা। তারা কিন্তু ক্ষেপে উঠলো। প্রতারকচক্রের সদস্য ভেবে পেটাতে শুরু করলো। তার অবস্থা এখন মর মর। আধমরা এ বৃদ্ধকে শেষে তারা পুলিশে দিল। স্টেশন এলাকায় প্রায় টহলরত পুলিশ সদস্যরা ভিক্ষুক হিসেবে তাকে চিনতে পারলো। তারা তার পরিচয়ের জন্য স্টেশন এলাকায় নিয়ে গেল। কিন্তু এ ভিক্ষুকের বাড়িঘরের পরিচয় কেউই জানেনা। হতভাগা করিম আলি এখন বেওয়ারিশ। সে এখন শুয়ে আছে লাশ কাটা ঘরে। 

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একজন করিম আলি

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles