এ্যামট্রেক! এ্যামট্রেক! স্বপ্নের এ্যামট্রেক!


বৈশালী রহমান : সেই থেকে একটা স্বপ্ন ছিল একদিন এই ট্রেনে চড়ে সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়াবো। সেই স্বপ্নের ঘোর ভাঙল প্রথমেই দোতলা সিঁড়ি বেয়ে ট্রেনে ওঠার সময় হোঁচট খেয়ে। কিছুতেই মাথায় এলো না, এত বড়ো ট্রেন, বিশাল স্পেস, প্রশস্ত সিট, তার সিঁড়িটা এত স্লিম কেন? সে কি সাইজ জিরো ফিগার পাওয়ার জন্য সাধনা করছে? এত অপ্রশস্ত সিঁড়ি যে একটা মোটামুটি সাইজের স্বাস্থ্যবান মানুষ যদি এই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যায় তবে শরীরটা একটু কাত করে উঠতে হবে। কোনোরকমে এই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সিটে বসতেই মন ভালো হয়ে গেল। আহা, সিট তো নয়, যেন পালকের গদি! আর সেই সাথে পুরা সিটটাকেই ব্যান্ড করে সামনের পা রাখার জায়গাটা তুলে দিয়ে বিছানা বানিয়ে ফেলা যায়। সিটে বসার প্রায় সাথে সাথেই সিঁড়িতে হোঁচট খেয়ে আহত পায়ের শুশ্রূষা করতে গিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেও জানি না। হায়! তখন কি আর ভাবতে পেরেছিলাম সিঁড়ির হোঁচটের চেয়েও বড়ো হোঁচট আমার জন্য অপেক্ষা করছে!

এ্যামট্রেক

ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম বরের ডাকে। সে বলল, “আমি বরিষাকে দেখছি, তুমি চাইলে এখন গিয়ে অবজারভেশন ডেকে বসে থাকতে পারো।” আমিও প্রায় লাফাতে লাফাতেই চলে গেলাম ডেকে।

অবজারভেশন ডেকটা মূলত ট্রেনের ক্যাফে। সম্পূর্ণ কাচ দিয়ে ঘেরা এই বগিতে রেস্টুরেন্টের টেবিলের মতো টেবিল এবং সংযুক্ত চেয়ার রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে কাচের দেয়ালের দিকে মুখ করে বসানো সিঙ্গেল এবং ডাবল সোফা। এক মগ কফি নিয়ে বসলাম একটা সোফায়। কি যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য! শীতকে উদাসীন সন্ন্যাসীর সাথে তুলনা করা হয়েছে অনেক সাহিত্যে। কিন্তু এসব এলাকা না দেখলে বোধহয় শীতের এই উদাসীন রূপের পরিচয় সম্পূর্ণ পাওয়া সম্ভব নয়। মাইলের পর মাইল যতদূর চোখ যায় শুধু দুটো রং। সাদা এবং ধূসর। দেখলাম তুষারে ঢাকা বিশাল পাহাড়, বন, সম্পূর্ণ তুষারিত মাঠ। একসময় ট্রেনের একজন এটেন্ডেন্ট এসে বললেন, সামনেই মিসিসিপি নদী পড়বে। দেখো, কিভাবে জমে বরফ হয়ে গেছে। দেখলাম, মিসিসিপি নদী তীরবর্তী অরণ্যের শোভা দেখে মুগ্ধ হলাম। ভাবের ঘোরে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছি, এমন সময় একটা কিচিরমিচির আওয়াজ শুনে ফিরে তাকালাম, এক পশলা বৃষ্টির মতো বরিষা এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। পিছে পিছে দেখি তার বাবাও হাজির। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। হায়, সংসার আমাকে মনে মনেও কোথাও হারিয়ে যেতে দেবে না।

বরিষা আর তার বাবাকে নিয়ে নিজের আসনে ফিরতেই দ্বিতীয় ধাক্কাটা খেলাম। এখানে প্রতি আসনের পাশেই প্লাগ পয়েন্টে মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এসে দেখি, চার্জার গায়েব। মোবাইলটা ভাগ্যিস সাথেই ছিল। ট্রেনের এটেন্ডেন্টকে জানালাম। সে উদাস মুখে জবাব দিলো প্রতি স্টেশনে কতো লোক ওঠে, নামে, বোধহয় কেউ নিজের চার্জার মনে করে নিয়ে চলে গেছে। আমি বিরস বদনে বললাম, তুমি বোধহয় জানো না, অন্যের জিনিস নিজের মনে করে নিয়ে গেলে সেটাকে চুরি বলে। এখন আমি কি করবো এইটা বলো। সে জবাব দিলো, বোধহয় নতুন চার্জার কিনতে হবে। কারণ আমরা তো সবসময় এনাউন্স করি, নিজের জিনিসপত্র সামলে রাখুন। আমাদের কিছুই করার নাই আসলে, দু:খিত। হতাশ হয়ে নিজ আসনে ফিরলাম। হায়! আমার স্বপ্নের এ্যামট্রেক তো এমন চোরের খনি ছিল না!

এরপর যা হয়, মোবাইলের চার্জ কিছুক্ষণ পরেই শেষ। আমার প্রথম কিছুক্ষণ বেশ হাত নিশপিশ করছিল। পরে দেখলাম, ব্যাপারটা তো মন্দ নয়! মোবাইল হাতে থাকলে মাথা নিচু করে ফেসবুকিং আর গেমস এই তো ব্যস্ত থাকতাম। তার বদলে চেয়ে দেখলাম জানালার বাইরে। প্রকৃতির কি অসাধারণ রূপ! কে বলে সুন্দর শুধু সবুজ রঙে! মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সাদা ধবধবে তুষার, আকাশের দিকে শুকনো ডালপালা বাড়িয়ে দেওয়া গাছগুলো, অরণ্য, জমাট বাঁধা হ্রদ, তুষার পর্বত, এগুলোর শোভা কি কম? মনে হচ্ছিল, ছোটবেলার রূপকথার গল্পে বর্ণিত জগতের মধ্যে দিয়ে ট্রেন ছুটছে, সাথে ছুটছি আমি, ফিরে যাচ্ছি শৈশবের দিকে।

দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টা ভ্রমণের পরে পৌঁছলাম শিকাগো স্টেশনে। ফার্গোর গরিবি হালতের স্টেশনের তুলনায় এ যেন প্রিন্স মুসার প্রাসাদ! আমরা দুই আনাড়ি বান্দা ব্যাগ, লাগেজ এবং বাচ্চাসহ কোনোমতে পৌঁছে গেলাম ওয়েটিংরুমে। পরবর্তী ট্রেনের জন্য দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। হঠাৎ দেখলাম, লোকজন খুব হইচই করে কিউতে দাঁড়াচ্ছে। মিজানও সাথে সাথে লাফ দিয়ে একহাতে লাগেজ আর আরেকহাতে বরিষাকে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। আমি বললাম, কিসের লাইন সেটা তো আগে জিজ্ঞেস করি! সে বললো এটা বোর্ডিং এর লাইন। আমি বললাম, বোর্ডিং এত তাড়াতাড়ি হবে কেন। সে বললো, কুতর্ক করো না তো! তাড়াতাড়ি লাইনে দাঁড়াও। আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। লাইনের সবার সামনে পৌঁছনোর পর গেইট ম্যান টিকেট দেখে বললো, এটা তো আপনাদের ট্রেনের বোর্ডিং না। আপনাদের বোর্ডিং আরো দেড় ঘণ্টা পরে। মিজানের মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো। আমারও বেশ মায়া হলো, তাই আর “কুতর্কের” কথাটা মনে করিয়ে দিলাম না।

শিকাগো স্টেশনে এক অতি কিউট এবং অতি স্মার্ট স্প্যানিশ বাচ্চার সাথে বরিষার বেশ ভাব হয়ে গেলো। বাচ্চাটার হাতে একটা ট্যাব ছিল। সেটা দেখে বরিষার আবার তার ফার্গোতে ফেলে আসা ট্যাবের কথা মনে পড়ে গেল। সে বাচ্চার কাছ থেকে ট্যাবটা চাইলো। বাচ্চাটাও সাথে সাথে সেটা দিয়ে দিলো। কোনো আপত্তি ছাড়াই। আমি তখন মিজানকে বললাম, দেখো, বাচ্চাটা কতো ভালো। বরিষাকে এসব একটু শেখাতে হবে। একেবারেই শেয়ারিং শিখে নাই। একটু পরেই মিজান একটা পৈশাচিক হাসি হেসে আমাকে বললো, একটু ওদের কাজ কারবার ফলো করো, তাহলেই ব্যাপারটা বুঝবা। আমিও ফলো করা শুরু করলাম। দেখলাম, বাচ্চাটা আসলে ওর ট্যাবে একটা গেম খেলে। একহাতে ট্যাব ধরে আরেক হাতে গেমটা খেলতে ওর অসুবিধা হয়। দেখলাম, বরিষা ট্যাবটা ধরে আছে, আর সে গেম খেলে যাচ্ছে। যেই বরিষাও গেমটা খেলতে চাইছে, সাথে সাথে সে ট্যাবটা ওর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ফেলছে। সাধে কি বলেছি, অতি স্মার্ট বাচ্চা!

শিকাগো থেকে পিট্সবার্গ, সেখান থেকে নিউইয়র্ক। নিউইয়র্কে এসে নামলাম পেনসিলভ্যানিয়া স্টেশনে। যাবো ব্রুকলিন। আমার “বড়োলুগ” জামাই আবার ট্যাক্সি ক্যাবের খোঁজ করে। আমি বললাম, নো, সাবওয়েতে যাবো। মাটির তলা দিয়ে চলাচল করা লোকাল ট্রেন। লোকাল হলেও কায়দাকানুনই আলাদা। পাঁচ মিনিট পর পর ট্রেন, চলে একেবারে ঝড়ের গতিতে। চল্লিশ মিনিটের সফরের পর নামলাম ব্রুকলিনের নিউ কার্ক এভিনিউ স্টেশনে। মিজানের বন্ধু গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। উনার বাসাই আমাদের সফর কালীন সময়ের অস্থায়ী ঠিকানা।

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ্যামট্রেক! এ্যামট্রেক! স্বপ্নের এ্যামট্রেক!

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles