গহীন বালুচর মুভি রিভিউ

সিনেমা শুরু হল- মাছ ধরার একটি দৃশ্য দিয়ে, এক পায়ে দাঁড়ানো বক-কে দেখে এক হাঁটু পানির তলায় এক চরের সন্ধান লাভ করল সুজন, শামিম আর শামিমের বাবা। কিন্তু তাদের এই আনন্দে


দিন দুয়েক পূর্বে লিখিত রিভিউ- রিভিউ- বছরের শেষ দেশীয় চলচ্চিত্র “গহীন  বালুচর” (২০১৭)- এমন সুনির্মিত, সাসপেন্স নির্ভর চলচ্চিত্র দর্শক খরায়  ভুগবে কেন?! 

আজ দেখতে যাব কি যাব না,আদৌ দেখব কি না- এমন  দ্বিধা-দ্বন্দ্বে নিজেই ছিলাম আসলে। মুভি গ্রুপে অল্পসংখ্যক হলেও খারাপ  রিভিউ দেখলাম না, বছরের শেষে একটি সুনির্মিত চলচ্চিত্র এসেছে বলেই ধারণা  হল। এমনই দ্বিধার বেড়াজালে পড়ে “হালদা” তো আর দেখা হল না, এভাবে সাতপাঁচ  করতে থাকলে “গহীন বালুচর” দর্শনও আর হবে না, তাই সকালের সিদ্ধান্তেই বেলা  বারটা নাগাদ রওনা হলাম বলাকা অভিমুখে। সঙ্গী  হলেন পিতা মহোদয় 

 পিতা-কে নিয়ে যাচ্ছি বলাকা প্রেক্ষাগৃহে, মনে তবু দ্বিধা ও খানিক ভয়!  বর্তমানে শ্মশ্রুমণ্ডিত পিতা মহোদয় সিনেমা হলে গমন অপছন্দ করেন না, কিন্তু  মাতা মহোদয়া- কী দুঃখ,কী দুঃখ- সিনেমা হল বড়ই অপছন্দ করেন বুঝি  ল্যাপটপ  যদি হয় শয়তানের বাক্স, সিনেমা হল হইল গিয়ে শয়তানের আস্তানা! পিতার সাথে  তারই প্রিয় নায়িকা  বর্ষা এবং  অনন্ত অভিনীত “মোস্ট ওয়েলকাম” দেখে এসেও  চোখের পানি একাকার করতে হয়েছিল, সাম্প্রতিককালে ছোট ভাই সমেত স্টার  সিনেপ্লেক্সে “ঢাকা  অ্যাটাক” দর্শন নিয়েও খানিকটা তুলকালাম; নিজের দিনকালও  মোটেই  সুবিধার  নয়, এমন সময় পিতাসমেত সিনেমা হলে অভিমুখী হওয়া মানে  “নিজের পায়ে কুড়াল মারা”, এ কথা পরিবারে রাষ্ট্র হলে কত নীতিবাক্য-ই না  শুনতে হবে, পিতাও তাতে যোগদান করতে পারেন! তারপরও ন্যাড়া আজ বেলতলাতেই মানে  সিনেমা হলে যাচ্ছে! 

 দ্বিতীয় মাত্রার ধাক্কা  দ্বিধা এল-সিনেমা হলে পৌঁছে! কী ব্যাপার শো শুরু  হয়ে গেছে না আজ আর শো হবে না? মুক্তির দ্বিতীয় দিন মাত্র, বন্ধের দিনও  বটে, “ঢাকা অ্যাটাক” মুক্তির দ্বিতীয় দিন সকালে এখানেই কত ভিড় আর লাইন  দেখেছিলাম, আর আজ কেমন সুনসান নীরবতা মাত্র! টিকিট কাউন্টার থেকে জানা গেল,  হ্যাঁ, বেলা ১ টার সময় শো হবে আর চারদিকে হাতেগোনা দু’তিনজনকে দেখা যাচ্ছে  মাত্র! যাই হোক, কি আর করার, এসে পড়েছি যখন, দেখেই যাই। আর সুবর্ণা  মুস্তাফা,রাইসুল ইসলাম আসাদের মত শক্তিমান অভিনেতারা তো আছেন-ই, দেখাই যাক  না! আর পোস্টারে পিতা-র ছোটবেলার বন্ধু-আরেক শক্তিমান অভিনেতা ফজলুর রহমান  বাবু-কে দেখা যাচ্ছে, দেখে পিতাও খুশি হলেন। যাক, ট্রেলার আর গানে গ্রামীণ  পটভূমিতে নায়ক-নায়িকাদের হালকা জড়াজড়ি ও চুম্বন  দৃশ্যও তো দেখা গিয়েছিল,  কিন্তু সিনেমায় যখন আব্বুর দোস্ত আছেন, তখন আর ভাবনা নেই!  আর নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদের কোন নাটক সম্পূর্ণ না দেখা হলেও তার সুনামের  ব্যাপারে ধারণা আছে- তিনি শক্তিশালী  অভিনেতা আর নবাগতদের যুগলবন্দী   নিয়ে,  ক্যামেরার চোখ দিয়ে শিল্পের সমাবেশ ঘটাবেন নিশ্চয়। এখন দর্শক মনে  কতটা হজম হয়-তাই দেখবার বিষয়!

সিনেমা শুরু হল- মাছ ধরার একটি দৃশ্য  দিয়ে, এক পায়ে দাঁড়ানো বক-কে দেখে এক হাঁটু পানির তলায় এক চরের সন্ধান লাভ  করল সুজন, শামিম আর শামিমের বাবা। কিন্তু তাদের এই আনন্দের মাঝে বাজে বিষাদ  আর কলহের সুর- কারণ এই ডুবে থাকা কালার চর নিয়ে এক যুগ আগে পাশের গ্রামের  সাথে যে দাঙ্গা-লড়াই হয়েছিল তাতে এই গ্রামের অনেক পুরুষকে প্রাণ হারাতে  হয়েছিল। সেই হিংস্রতার প্রতিশোধ নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে  সুবর্ণা  মুস্তাফার চরিত্র সবাইকে যেমন উদ্বুদ্ধ  করেন, অন্যদিকে সুজন স্বপ্ন দেখে  তার নায়িকা পারুলকে নিয়ে সেই চরে ঘর বাঁধার! আর তারপর… বাকিটা খানিকটা  অনুমেয়, খানিকটা সাসপেন্সে ভরাও কাহিনী! সাসপেন্স?! জী, গ্রামের চর দখল  নিয়ে কাইজ্জা আর এর মাঝে নায়ক-নায়িকার প্রেম-ভালোবাসা মার্কা কাহিনী হলে  ঘুমঘুম চোখে ঢুলুঢুলু করব ভেবেছিলাম! কিন্তু ভাগ্য ভালো- নির্মাতার  মুন্সিয়ানায় তা করতে হয় নি।

  ত্রিভুজ প্রেমের গল্প আছে এই সিনেমায়, কিন্তু চিরায়ত ভঙ্গিতে আসে নি। আর  নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনীও মূল উপজীব্য ছিল না। পার্শ্ব চরিত্রে শক্তিশালী  অভিনেতারা ছিলেন এবং তাদের চরিত্রগুলো কাহিনীতে বেশ গুরুত্ব নিয়েই এসেছে-যা  এ সিনেমার অন্যতম ভালো দিক। আর রাইসুল ইসলাম আসাদের ছেলের চরিত্রে জিতু  আহসান সেই রকম খলনায়কগিরি দেখালেন,  আর তার ছায়াসঙ্গী-দ্বৈতচারী ফজলুর  রহমান বাবু-ও কম গেলেন না! জিতু আহসানের সাথে শাহাদাৎ হোসেনের দ্বন্দ্ব এ  সিনেমার সেরা সাসপেন্স ও থ্রিলিং পার্ট হয়ে থাকবে! তাছাড়া নায়ক ও দুই  নায়িকার কর্মকাণ্ডের দিকে চোখ তো রাখতেই হয়! সাথে সুবর্ণা মুস্তাফা, আসাদ  থেকে রুনা খান-সবার অভিনয় পারদর্শিতার সম্মিলন তো রয়েছেই!

 তিন  নবাগতের ব্যাপারে বলতে গেলে- দর্শক মনকে পুরোপুরি তুষ্ট করেছেন তারা-  একেবারে ন্যাচারাল অভিনয় দিয়ে! আবু হুরায়রা তানভীর- বাংলা লিংকের  বিজ্ঞাপনে কবি ভাবের তরুণ চরিত্রে যেমন মানিয়েছিলেন, ‘গহীন বালুচর’ এর  প্রেমিক যুবক চরিত্রে তেমনি চমৎকারভাবে মানানসই ছিলেন, খুব ভালো অভিনয়  করেছেন তিনি। আর একটু শক্ত গোছের নায়িকা পারুল চরিত্রে  জান্নাতুন নূর মুনও  সাবলীল অভিনয় করেছেন বেশ সাদামাটা বেশভুষায়   । তারপর আরেক নায়িকা  নীলাঞ্জনা নীলা- তার চরিত্র গঠন বিচারে কৃত্রিমতা ও ন্যাকামি দুই-ই আসি আসি  করার সমূহ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু শেষমেশ  এল শুধুই সৌন্দর্য  তার চরিত্রের পরিণতি দেখতেই সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতীক্ষা; তারপর বাসায় ফিরে  উইকি-তে দেখলাম, এর মাঝে অনেক নাটক-বিজ্ঞাপনে নাকি অভিনয় করেছেন, কিন্তু  এতদিন চোখে পড়ে নি তো! তার মানে এখানেও পরিচালক-কলাকুশলী পোশাক পরিকল্পনায়  ওয়াহিদা মল্লিক জলি, শিল্প নির্দেশনায় উত্তম গুহ ছিলেন দেখলাম) –দের  কৃতিত্ব, গানের মত করেই কাঞ্চাবরণ কন্যাকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করা  হয়েছে। সাথে নবাগত শিল্পীরা শক্তিমান অভিনেতাদের সাহচর্য পেয়েও ধন্য হয়েছেন  নিশ্চয়, ভবিষ্যতে কুশলী নির্মাতাদের সাথে ভালো ভালো কাজ উপহার দিন তারা-  এই  শুভকামনা রইল।

মাঝে মাঝে একটু কৃত্রিমতা, বেশি ছিমছাম ভাব  লেগেছে হয়তো; সাথে সুবর্ণা মুস্তফার নাটুকেপনা দিয়ে শুরু  চরিত্রটিও কেমন  অবোধ্য থেকে যায়- যে কাটা মস্তক দেখতে চায়, সে-ই বাড়ির বউ শর্মীমালার এক  কথাতেই নরম ভাব দেখায় কেন ঠিক  বোঝা গেল না! আর বাপ্পা মজুমদার-মুন্নীর  কণ্ঠ দেয়া “ভালোবাসায় বুক ভাসাইলা” গানটি ঠিক আছে, বাকি কয়েকটি হলের সাউন্ড  সিস্টেমের জন্য না কি অন্য কারণে আগেকার কলকাতাই সিনেমার গানের মত মনে হল!  ব্যবসায়িক বিচারেই হয়তো কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দিয়ে গান আমদানি করে  মিউজিক্যাল ড্রামা আবহ আনতে হয়েছে, কাহিনীর দু’ একটা অনুমেয় বাঁকও সে বিচার  থেকেই হতে পারে অথবা এ রকমটা হলে দর্শকের মনে দাগ কাটবে-সে ভাবনা থেকে  হয়েছে! সে যাই হোক, শেষমেশ ক্যামেরার কাজ আর গ্রামের নান্দনিক চিত্রায়নের  প্রশংসাও করতেই হয়।কোথায় শুটিং হয়েছে জানেন? ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায়!  হায়-হায়, ঝালকাঠিতে আমার নানা বাড়ি, কিন্তু নদী আর নদীপাড়ের এত সৌন্দর্য  কখনো চোখে ধরা পড়ে নি! নাহ, প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য আলিঙ্গন করতে হলে নায়ক  সুজনের মত নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে কাদামাটি নাড়াচাড়া করতে হয়, নায়ক-নায়িকার মত   নৌকা বেয়ে যেয়ে বালির চরে ঘরের ছবি আঁকতে হয়- এসব পারি না যখন কী আর করার!

সব মিলিয়ে বেশ গতিশীল আর শেষ অবধি দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখার মত কাহিনীপ্রবাহ-ই ছিল বলা চলে। ভালোবাসা আর কলহের শুভ বা অশুভ পরিণতি দর্শক  মনকে এতটুকু হলেও স্পর্শ করবেই। ওভারঅল আমার প্রদত্ত  রেটিং তাই ৮/১০

“গহীন বালুচর” নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদের প্রথম চলচ্চিত্র (এর আগে তার “খণ্ডগল্প’৭১” টেলিফিল্ম হিসেবে নির্মিত হয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিল্ম হিসেবে  নাকি প্রচারিত হয়েছিল!) যে মুন্সিয়ানা তিনি দেখিয়েছেন এ চলচ্চিত্রে , তার  আরও আরও কাজ দেখার প্রত্যাশা রইল- যদি এ ছবিটি ব্যবসাসফল না হয়, তারপরও!  হ্যাঁ, মোটে ২৮ টি হলে মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্রটি (নির্মাতা বলেছেন, কৌশল  হিসেবে!) , আর মুক্তির পরদিনের শো-তেই এমন দর্শকখরা দেখলাম! তারপরও…  চূড়ান্ত আশাবাদী হয়ে প্রত্যাশা করব, দিনের বাদবাকি শো-গুলো হয়তো ভালো  গেছে,বাদবাকি হলগুলোতেও নিশ্চয় ভালো ব্যবসা করছে! এমন সুনির্মিত, সাসপেন্স  দেয়া চলচ্চিত্র এটা ডিজারভ করে! এর পূর্বে ৬৮টি হলে মুক্তিপ্রাপ্ত “ অন্তর  জ্বালা” আর পরে আগমনের অপেক্ষায় থাকা সম্ভাব্য সুপারহিট “ইন্সপেক্টর নটি  কে” না  দেখেই বলে দেয়া যায়-ওসব নকল কবলিত, বাজারে চলচ্চিত্র কালের গর্ভে  শীঘ্রই হারিয়ে যাবে, ভবিষ্যতের ফিল্ম আর্কাইভে আমাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব  করতে পারে “গহীন বালুচর”এর মত চলচ্চিত্র আর সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরাই!  “ঢাকা  অ্যাটাক” দেখতে যদি ছুটতে পারি, “গহীন বালুচর” দেখতে কেন নয়? জনপ্রিয়  নায়ক-নায়িকা আর মালয়েশিয়ায় নাচ গান দেখানোর অভাবে? পর্যাপ্ত থ্রিল তো এ  ছবিতেও রয়েছে, দীপঙ্কর দীপনের মত সৌদ-ও নবাগত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে  আশাবাদ বেশ পূর্ণ করেছেন। জি বাংলা বা হিন্দি সিরিয়াল প্রিয় নারী থেকে নিজ  দেশের চলচ্চিত্রশিল্প সম্পর্কে হতাশ মানুষজন এবং অবশ্যই  গল্প-কাহিনী-নির্মাণ বাছবিচার করা আপামর সাধারণ দর্শক- আপনার নিকটস্থ  প্রেক্ষাগৃহে “গহীন বালুচর” চলে থাকলে একবার ঢুঁ মেরে আসতে পারেন, কষ্টার্জিত পয়সার অনর্থ হবে না, এ ধরনের জীবনঘনিষ্ঠ নির্মাণকেই প্রণোদিত  করা হবে- বছরের শেষ দেশীয় চলচ্চিত্র হিসেবে দেশ আর গ্রামীণ প্রকৃতির  প্রতিনিধিত্ব-ই তো করেছে এই ছবিটি। আর এভাবে পর্যাপ্ত দর্শক সমাগমেই সিনেমা  হল-গুলো কারো  চোখে শয়তানের আস্তানা না হয়ে পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র  হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে! এই আশাবাদ ব্যক্ত করে লেখার সমাপ্তি টানলাম  

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গহীন বালুচর মুভি রিভিউ

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles