ঘুরে আসুন ভোলায়


সমুদ্রের মাঝে একখানা আসল বাংলার চেহারা দেখা যায় ভোলা যেতে পারলে, ৭ টি উপজেলা নিয়ে বাংলাদেশের একমাএ বৃহত্তম প্রাচীন গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ও জেলা শহর। মোটামুটি সকল নাগরিক সুবিধা আছে ভোলায়, জেলার স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শণের সাথে তালমিলিয়ে ছোট এই শহরকে একদেখায় অপরুপই লাগবে, সব উপজেলা ঘুরলে বৈচিএ দেখা যায় উপকূল ভেদে, কোথাও জোয়ার ভাটা কোথাও ফসলে ভরা নদীর আর সাগরের অববাহিকা,এখানকার মানুষগুলো ও সরল।

গাঙ্গেয় অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত দেশের একমাত্র দ্বীপ ভোলা। বর্তমান ভোলা একদা বৃহত্তর বরিশাল জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৮৫৪ সালে দ্বীপটি মহকুমায় উন্নীত হয়। ভোলার আদি নাম ছিল দক্ষিণ শাহবাজপুর। চারদিকে নদী পরিবেষ্টিত এ জনপদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আবহমান বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতোই। এলাকার কিংবদমত্মী, মসজিদ মন্দিরের স্থাপত্য ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শণ বিশে­ষণ করলে অনুমিত হয় এ জনপদ মাত্র ৭/৮ শত বছর আগে সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত হয়েছে। মহারাজা কন্দর্প নারায়ণের কণ্যা বিদ্যাসুন্দরী ও কমলা রাণীর দিঘির ইতিহাস এ অঞ্চলের লোক সংস্কৃতির একটি অংশ।

এ দিঘির কাহিনী নিয়ে সুদুর তামিলনাড়ুর নিম্নাঞ্চলে এখনও গান পরিবেশিত হয়। মেঘনা, তেঁতুলিয়া বিধৌত বঙ্গোপসাগরের উপকুলে জেগে ওঠা প্রায় ৯০ মাইল দৈর্ঘ্য ও ২৫ মাইল প্রস্থ বিশিষ্ট এ ভূখন্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যেদিকে চোখ যায় সব দিকে শুধু সমতল ভূমি। ফসলের দোলায়মান দিগমত্ম বিসত্মৃত মাঠ দেখে মানুষের মনে জেগে ওঠে বাউলের গান ও রাখালের বাঁশীতে ভর করে মোহনীয় সুর। প্রাকৃতিক সুষমামন্ডিত এ এলাকার গাছ গাছালী, পাখীর কুজন বারমাসী ফলমূল সত্যিই উলেস্নখযোগ্য। হিমালয় থেকে নেমে আসা ৩টি প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র বাহিত পলি দিয়ে মোহনায় গড়ে উঠেছে এ দ্বীপ। সমুদ্র সমতল থেকে এর গড় উচ্চতা ১২ ফুটের মতো। নৃ-তত্ত্ব ও ভূ-তত্ত্ববিদরা মনে করেন ‘‘পূর্ব দিকে মেঘনা ও পশ্চিম দিকে তেঁতুলিয়া নদী বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসে গতিবেগ হারিয়ে ফেলে। ফলে এ শামত্ম স্থানটিতে কালক্রমে পলি ও নদীতে বয়ে আসা বর্জ্য জমা হয়ে আজকের ভোলা নামক দ্বীপটির জন্ম।’’ভোলার জন্ম খুব বেশি দিনের নয়। আনুমানিক ১২৩৫ সালের দিকে দ্বীপটি গড়ে ওঠতে শুরম্ন করে।

এখানে প্রথম চর পড়া শুরম্ন হয় ১২৩৫ সালের দিকে এবং ১৩০০সালের দিকে চাষাবাদ শুরম্ন হয় বলে জে. সি. জ্যাক বাকেরগঞ্জ গেজেটিয়ারে উলেস্ন­খ করেন। এলাকার ধান, চাল, সুপারি, নারিকেল ও অন্যান্য প্রাচুর্যে প্রলুব্দ হয়ে একের পর এক বিদেশী শাসক ও পর্তুগীজ জলদস্যুরা এসেছে এখানে। ১৫০০ সালের দিকে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের নজর পড়ে এ দ্বীপটির ওপর। তারা দ্বীপটিকে ঘাঁটি বানিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিঘ্নে লুটপাট চালিয়ে যেতে থাকে। এছাড়াও আরাকানের বর্গি ও মগরা দক্ষিণ শাহবাজপুরসহ আশেপাশের দ্বীপকে ঘাটি বানিয়ে লুটপাট চালিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করে রাখত। এরই প্রেক্ষাপটে সম্ভবত রচিত হয়েছিল – ‘‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিব কিসে ? ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কি ? আর কটা দিন সবুর কর রসূন বুনেছি’’- এখানকার সংস্কৃতিতে রয়েছে মিশ্র প্রভাব। ভোলার মেঘনা তেতুলিয়ার তীর ঘেষে রয়েছে ছোট ছোট জেলে পল্লী। মাছ ধরা মৌসুমকে সামনে রেখে পল্লীর মহিলা ও শিশু কিশোররা পালাগান গেয়ে রং বেরংয়ের সুতা দিয়ে জাল বোনে। এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এসব জাল টানানো হয়। তখন বাড়িতে বাড়িতে চলে উৎসব। এখানে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও অনেক জমিদার বাড়ি সগৌরবে দাড়িয়ে আছে। যেমন- মানিকা মিয়া বাড়ি, কুতুবা মিয়া বাড়ি, দেউলা তালুকদার বাড়ি, পরান তালুকদার বাড়ি, রজনী করের বাড়ি ইত্যাদি। তবে দৌলতখানের জমিদার কালা রায়ের বাড়ি ছিল বিখ্যাত। তার প্রাসাদে হতো বাইজী ও ক্লাসিকাল ঢঙের ওস্তাদদের গান।

নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এ বাড়ি। এছাড়া জাগ্রত মাজার হচ্ছে হযরত উজির চান করনীর মাজার। ভোলার ঘুইঙ্গার হাটের মিষ্টি ও ঘোষের দধির সুনাম দীর্ঘকাল ধরে। অতিথি আপ্যায়ন ও জামাই আপ্যায়নে ভোলাবাসীর প্রথম পছন্দ এ দধি ও মিষ্টি। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এ মিষ্টি ও দধি উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়। ভোলায় এককালে লবণ তৈরি হতো। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি খাল দিয়ে ভোলায় অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে লবণাক্ত পানি আটকিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে লবণ তৈরি করা হতো। অধিকাংশ লবণ তখন তজুমদ্দিন, মির্জাকালুতে বিক্রি হতো। ব্রিটিশ সরকার লবণ কর বৃদ্ধি ও নানা বিধি-নিষেধ আরাপ করায় ১৯৩০ সালে ভোলায় লবণ আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৩০ সালের ১লা বৈশাখ পুলিশের গুলিতে ২জন মারাও যায়। পরে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও সে স্মৃতি আজো অম্লান হয়ে আছে। ভোলা একটি গ্যাস সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত।

ভোলা শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ডে ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ আছে। এ নৈস্বর্গিক দ্বীপ ভোলা জেলায় মূল্যবান প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ শুধু জেলাবাসীর জন্যই নয় সমগ্র দেশের জন্য আশানুরূপ সুফল বয়ে আনার প্রত্যাশা রাখে। এ জেলায় উৎপাদিত রূপালী ইলিশ ভোলা বাসীর চাহিদা পূর্ণ করে দেশের অন্যান্য জেলায় এমনকি বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সপ্তম হয়েছে। চরফ্যাশন,তজুমুদ্দিনসহ অন্যান্য উপজেলায় উৎপাদিত বাগদা চিংড়ি চাষের মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনেক মৎস্য চাষী মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের সুফল বয়ে এনেছেন।

বোরহানউদ্দিন উপজেলায় প্রাপ্ত গ্যাস সম্পদকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলনের মাধ্যমে গোটা দক্ষিণাঞ্চলকে গ্যাসের আওতায় এনে এখানে স্থাপন করা যায় একটি সার কারখানা। এছাড়াও এ গ্যাস দিয়ে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব। ইতোমধ্যে ৩৪.৫ মেগাওয়াট বিদ্যূৎ পস্নান্টে এ গ্যাসের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরম্ন হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে ভোলার দক্ষিণে চর কুকরী মুকরী, ঢালচর, লতার চর ও চর নিজাম সহ অসংখ্য চর। নৈসর্গিক দৃশ্য সম্বলিত এ চরগুলো হতে পারে পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। সমস্যা ও সম্ভাবনার বেদীমূলে দাঁড়িয়ে আজকের ভোলা তাকিয়ে আছে সামনের পানে।

খাদ্যে উদ্বৃত্ত ও রূপালী ইলিশ সমৃদ্ধ হলেও ঝড়-জ্বলোচ্ছাস ও নদী ভাঙ্গনের তান্ডবকে নিয়তির অমোঘ বিধান বলে মেনে নিয়েছে এখানকার মানুষ। তাই বলে তারা থেমে থাকেনি। একটি সুন্দর ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তারা অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছে সম্মুখের পানে। এ গ্যাস দিয়ে ভোলার চাহিদা মিটিয়েও বাইরে পাঠানো যায়। এ গ্যাস দিয়ে ইতোমধ্যেই একটি সার কারখানা স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে ৩৪.৫ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

ভোলা মহিষের বাথানের জন্য বিখ্যাত। ভোলার বিভিন্ন চরে অর্ধশতাধিক মহিষের বাথান আছে। এসব বাথান থেকে প্রতিদিন শত শত কেজি দুধ উৎপাদিত হয় এবং এ দুধ থেকেই তৈরি হয় বিখ্যাত মহিষের দধি, পনির ও ঘি। এসব ভোলার বাইরে পাঠানো হয় বিক্রির জন্য। ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরা ছিল পর্তুগীজ দস্যুদের দখলে। পরে এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন বসতি স্থাপন করে। এখানে কান লম্বা, কেশর ভরা বিখ্যাত জাতের কুকুর ছিল। এখন বিলুপ্ত প্রায়। এখানে পর্তুগীজের তৈরি করা প্যাগোডার ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেছে। এখানে গ্রামাঞ্চলে দাড়িয়াপাল্লা, ফুটবল, কাবাডি, হাডুডু খেলার প্রচলন ছিল। এখনও এসব খেলা হয়। ভোলার কলঘাট এলাকায় একসময় স্টিমার ঘাট ছিল। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন এটি শুধু স্মৃতি।

যেখানে খেতে পারে : সদর বাজারে ভালো দাম ও মানের মধ্যে দিদার হোটেল,বিদ্যুৎ অফিস এর সামনের হোটেলটা (নাম জানিনা) আর  ফ্রেশ দধি বা মিষটির জন্য ঘোষ দধি ঘর সহ অনেক দোকান আছে .. ইলিশ মাছ খেতে ভুলবেন না তাছাড়া সামুদ্রিক অনেক মাছও পাওয়া যায়.

যেভাবে যাবেন- ঢাকা হতে নদী পথে দূরত্ব ১৯৫কি.মি.।সড়কপথে বরিশাল হয়ে সড়কপথে দূরত্ব ২৪৭কি.মি. এবং লক্ষীপুর হয়ে দূরত্ব ২৪০কি.মি.। লঞ্চযোগে(সরাসরি)৮/৯ ঘন্টা, বাসযোগে(ভায়া বরিশাল) ৭/৮ ঘন্টা এবং বাসযোগে (ভায়া লক্ষীপুর)৬/৭ ঘন্টা সময় লাগে।

বাই রোটেশনে লঞ্চ ও চলাচল করে…১ম শ্রেণী -৯০০/-৩য় শ্রেণী- ২০২/- টাকা দরে ঢাকা টু ভোলা প্রতিনিয়ত রাত ৭.৩০ ও ৮.৩০ টায় ছেড়ে সকাল ৬ টা নাগাদ পৌঁছে যায়। ভোলা টু ভোলা প্রতিনিয়ত রাত ৭.৩০ ও ৮.৩০ টায় ছেড়ে সকাল ৬ টা নাগাদ পৌঁছে যায়। আবার বরিশাল থেকে speed বোটে সরাসরি ভোলা যাওয়া যায় ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা করে

সচেতনতা: ঘুরতে গিয়ে অপচনশীল দ্রব্য ফেলে প্রকৃতির ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকুন এবং সকলকে পরিবেশ রক্ষায় উৎসাহিত করুন।


Like it? Share with your friends!

0
2 shares

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঘুরে আসুন ভোলায়

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles