জাদুর শহর ১ম পর্ব


লেখা: Shadbin ShaQil

-মেঘনা মসজিদের ঈমাম সাহেব তোর মায়ের জানাযা আসর বাদে শুরু করবে তোগো কাছে একবার জিজ্ঞাসা করতে কইলো।
-জানাজার ব্যবস্থা করেন ফুফু!
-তোর আপা আর বৃষ্টি যদি দেখতে চায় তাইলে একবার আইতে ক !

-বারবার দেইখা চোখ ভাসাইয়া দিলেও আম্মা আর ফিরে আইবো না।
পিছন থেকে কেঁদে কেঁদে বৃষ্টি জবাব দিয়েই আমার কোলে ঝাপিয়ে পড়ে আরো জোড়ে কাঁদতে লাগলো।

মাত্র ১৬ বছর বয়স আমার ছোট বোন বৃষ্টির।২ বছর আগেই আমাদের বাবা মারা যায়। আমাদের ৩ বোনের মধ্যে বৃষ্টি সবচেয়ে আদরের ছিলো মায়ের।মায়ের হাত ছাড়া ভাত পর্যন্ত খেতে পারতো না ও। তবে বৃষ্টি খুব কান্না করতে পারে, তাই মায়ের মৃত্যুতে কাল রাত থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কান্না করে মনকে অনেক হাল্কা করেছে! কিন্তু মায়ের মৃত্যু শোকে সবথেকে যে মানুষটি পাথর হয়ে আছে আর আমাদের ২ বোনের কথা ভেবে চিন্তায় অধীর হয়ে আছে সে হলো আমার বড় বোন মায়া আপা। কাল রাত থেকে আপা একটা ও কথা বলেনি,শুধু নিশ্চুপ চেহারায় চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়তে দেখেছি কয়েকবার। বৃষ্টির চেয়ে মায়া আপা ১০ বছরের বড়। আর আমি আপার চেয়ে ৩ বছরের ছোট।
আম্মা বেঁচে থাকতে আপার অনিচ্ছা সত্তেও আপার বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছিলো একবার এক শহরের ছেলের সাথে কিন্তু পাশের বাড়ির মানুষজনের ভাঙানিতে বিয়ে ভেঙে যায়।এখন আপার দিকে তাকাতে পারছিনা আমি,একমাত্র আলেয়া ফুফু ছাড়া আমাদের আপন বলতে কেউ নেই এই গ্রামে।

মায়ের লাশের খাটিয়া যখন কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন বৃষ্টির কান্নার আওয়াজে পাশের ৩ গ্রামের মানুষ আরো একবার সমবেত হয় আমাদের বাড়ি।লোকজন অবশ্য আমাদের নিয়ে অনেক কথা বলে আর আফসোস ও করে,যে কথাটা মানুষের মাঝে বেশী বলতে শোনা যায় তা হলো,
-ইস! ৩ ডা ডাঙর মাইয়্যা থুইয়া বাপ-মা ২ জনে চইলা গেলো, এখন ওগো বিয়্যা-সাদি ক্যাডা করবো..?

গ্রামের মুরুব্বিদের আলেয়া ফুফুর সাথে অনেক আলোচনা ও করতে শুনেছি এই নিয়ে।মায়ের দাফনের আগেই আমাদের বিয়ের চিন্তায় পাগলপ্রায় মানুষদের প্রতি ক্ষোভের অন্ত ছিলো না আমার।বৃষ্টি অবশ্য ২-৩ জনের সাথে ঝগড়া ও বাধিয়ে দিয়েছিলো এই নিয়ে,আমি না থামালে হয়তো ও মারপিট ও করতো।

পুরো ১ দিন ২ রাত কোন কথা বলেনি মায়া আপা,প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি,বাড়িতে আলেয়া ফুফু অনেক কষ্টে শুধু একবার ভাত খাইয়ে দিয়েছিলো আপাকে।

ফুফুঃ তুই যদি খাওয়া দাওয়া ছাইড়া দিয়া রোগ বাধাও,তোর বইনগো এখন কেডা দেখপে? মানুষ নানারকম কথা কইতেছে,চেয়ারম্যান কইছে তোর আর মেঘনার বিয়ার ব্যবস্থা করবে! ৩ ডা মাইয়্যা গ্রামে এরকম থাকলে মানুষ খারাপ কয়।
আপাঃ চেয়ারম্যান আমাগো কেমন পোলার লগে বিয়া দিবো তা জানা আছে ফুফু,আমার একটা শেষ উপকার করবা??

ফুফুঃ যদি জীবনডা দিয়াও তোগো কষ্ট দূর করতে পারতাম এহন তাও করতাম !
আপাঃ আমরা ৩ বোন আগামীকাল রাতে শহরে যামু,তুমি আমাগো সাহায্য করবা ফুফু?

ফুফু চোখ বড় বড় করে আপার দিকে তাকিয়ে আছে….

-কি কছ তুই মায়া?বাপের ভিটা ছাইড়া শহরে যাইয়্যা কি করবি?
-চাকরি করমু,আমার এক শহরের বান্ধবীর সাথে কথা হইছে,ও একটা ব্যবস্থা কইরা দিবে,আমি আম্মারে মরনের আগে কথা দিছি,মেঘনা আর বৃষ্টির বাকী পড়ালেখা শেষ করামু।

ফুফু আরেকদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন কিছু একটা ভাবলো,
-যে দায়িত্ব নিতে যাইতেছ তা পারবি তো মায়া?
আপাঃ এখন আমি সবকিছু করতে পারমু ফুফু! কিন্তু এই গ্রামে মানুষ আমাগো বাঁচতে দিবোনা।তুমি আর না কইও না।

ফুফু আর কিছু না ভেবে “মেঘনা” “মেঘনা” বলে ডাক দিলো…. আমি আঢ়ালে দাঁড়িয়ে এতোক্ষন আপা আর ফুফুর কথা শুনছিলাম,ডাক দিতেই চলে আসলাম,

আপাঃ বৃষ্টি আর তুই এখন থেকেই সবকিছু গুছিয়ে নে মেঘনা, কাল রাতেই আমরা শহরে যাচ্ছি!  আমি কোন প্রশ্ন না করে ফুফুর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম,
-আচ্ছা! মায়ের মৃত্যুর ১ দিন পরেই আপার কথামতো ফুফুর সাহায্য শহরের পথে পাড়ি দিলাম আমরা ৩ বোন!
সত্যি বলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল সেদিন গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে।কিন্তু গ্রামের মানুষের নানান কথাশুনে বেঁচে থাকার চেয়ে সেদিন এটাই হয়তো ঠিক ছিলো।আমি যতই কষ্ট পাইনা কেনো আপার কষ্টের কাছে আমার কষ্ট যে মূল্যহীন। জীবনের ২৬ বছর এই গ্রামে পাড় করেছে আপা,আপার সবথেকে সুখ দুঃখের কাছের মানুষ ছিলো মা,তিনি চলে যাওয়াতে আপা কতটা মানুষিক কষ্ট পেয়েছে তা আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝি।

বৃষ্টি ছোটবেলা থেকেই চাইতো শহরে আসবে।সবসময় বলতো বিশাল বড়লোক বিয়ে করে শহরে চলে আসবে,বিলাশবহুল জীবন কাটাবে আর গ্রামে ফিরবেনা কোনদিন! শত কষ্টের মাঝেও আজ বৃষ্টি যে অনেকটা আনন্দিত ছিলো তা ওকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে।

ফুফুর দেয়া কিছু টাকা আর আমাদের জমানো যার যা ছিল সেই টাকা সহ মায়ের বানানো গয়না আমাদের শেষ সম্বল ছিলো!
তবে যতদূর জানতাম আপার নামে কিছু টাকা বাবা অনেক আগে ব্যাংকে ফিক্সড করে রেখেছিল,যেহেতু আপার ভরসায় আমরা শহরে যাচ্ছি তাই এই নিয়ে আর প্রশ্ন করিনি আপাকে।কিন্তু এতো কম টাকাপয়সা দিয়ে ৩ জনের কতোদিন চলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি!
শহরে যাওয়ার পথে বাসের পাশাপাশি সিটে আমি আর বৃষ্টি বসে আছি,আর আপা সামনের সিটে,বৃষ্টি কানের কাছে এসে চুপিচুপি বললো,
-মেঘনা আপু আমরা শহরে যাইতেছি! চিন্তা করিওনা দেইখো এইবার আমাগো জীবন বদলাইয়া যাইবো।

আমি বাসের সিটের সাথে হেলান দিয়ে আছি,
-মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে বৃষ্টি, মায়া আপার দিকে তাকাতেও পারছিনা।

-মেঘনা আপু আমরা নিজেদের কষ্ট নিজেরা ভাগ করে নিমু দেইখো,জাদুর শহরে যেয়ে জীবন জাদু দিয়া বদলাইয়া ফেলমু।

বৃষ্টির কথায় আর কান না দিয়ে আমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম,বৃষ্টি বরাবরই স্বপ্নের দুনিয়াতে থাকে,কিন্তু মায়া আপা অনেক বাস্তববাদী।

আমরা যখন শহরে পৌঁছালাম তখন ভোর ৫ টা,আবছা আলোতে চারদিকের দালানকোঠা একবার দেখে নিলাম।আপার সবথেকে কাছের বান্ধবী সুমাইয়ার হাজব্যন্ড আমাদের গাড়ি থেকে নিতে আসছিলো বাসষ্টান।লোকটা কে আমার খারাপ লাগেনি,হাসিমুখে আমাদের বরন করলো,কিন্তু এতোগুলো মানুষ একসাথে শহরে একটা মানুষের বাসায় যাবো ভাবতেই খারাপ লাগছিলো। আপা অবশ্য যেতে যেতেই লোকটার সাথে নিজেদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছিলো,তবে বৃষ্টির চোখমুখে শহরে আসার যে আনন্দের ছাপ দেখছিলাম তাতে মনে হচ্ছিলো মায়ের মৃত্যুর শোক ও প্রায় ভুলে গেছে।

আপার বান্ধবী সুমাইয়া আপার বাসাটা অনেক ছোট তবে বেশ সাজসজ্জাপূ্র্ন।ছোট পরিবার থাকার জন্য একদম পারফ্যাক্ট বলা যায়।সুমাইয়া আপা অনেক আপ্যায়ন করেছেন আমাদের।বৃষ্টি বাসায় এসেই ফ্রেশ হয়ে খেয়ে যে ঘুম দিয়েছে আর উঠার নাম নাই।

পরেরদিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিলো আমাদের।তবে আপাকে কাছে পেতাম খুব কম সময়।সুমাইয়া আপুর হাজব্যন্ড এর সহযোগীতায় মায়া আপা খুব দ্রুত একটা চাকরী পেয়েও যায়,আমিও বিকেলের টাইমে একটা কফি সপে পার্ট টাইম কাজে লেগে যাই,বৃষ্টির কলেজে ভর্তি থেকে শুরু করে নতুন বাসায় উঠা সবকিছুতে আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে হয়েছে বলতে হবে।

আপার সাথে খুব কম কথা হতো আমার এই দিনগুলোতে,মা যখন বেঁচে ছিলো তখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপা আর আমি তর্ক করতাম।কিন্তু মায়া আপা এখন শুধু আমাদের বড় বোন না বরং মা হয়ে উঠেছিল। তাই বাসায় শুধু বৃষ্টি আর আমিই কথা বলতাম সারাদিন,আপা সবকিছুতে শুধু হ্যা আর না জবাব দিতো,আর সেই সকালে বের হতো আর ফিরতো অনেক রাত করে।২ টা বেড রুমের একটা ছোট বাসায় আমি আর বৃষ্টি এক রুমে আর এক রুমে আপা থাকতো।

আমি যে বাসার কাছে যে একটা কফি শপে কাজ করতাম এই বিষয়টা অবশ্য আপাকে জানাইনি।তবে আমি সবচেয়ে অবাক হই যখন আপা আমার ইউনিভার্সিটির ভর্তির ব্যবস্থা খুব দ্রুত করে ফেলে তাও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি।যার খরচ চালানোর কথা আমাদের পক্ষে চিন্তা করাও সপ্নের মতো।
বৃষ্টি অবশ্য নিজের নতুন কলেজ নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে,যখন যা চায় তা পেয়ে যাওয়ায় খুশির অন্ত ছিলোনা তার।
শুধু তাই নয়য়,প্রায় ৬ মাসের মাথায় আপা নতুন বড় এক বাসা নেয়,বাসার উঠার কিছুদিন পর টিভি,ফ্রিজ,ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি সব ফার্নিচার বাসায় দিনের পর দিন আসতে থাকে।এসবে আমি অবাক হই ঠিকি কিন্তু সসবচেয়ে বেশী অবাক হই আপার হেয়ার ষ্টাইল,চালচলন এর ষ্টাইল,আর পোশাকের ষ্টাইল দেখে, ৬ মাসে আমার আপাকে দেখে মনে হচ্ছিলো আমি টিভি সিরিয়ালের কোন নায়িকাকে দেখছি।একদিন রাতে খাবার টেবিলে বসে আছি আমরা ৩ বোন…

আপাঃ কাল থেকে তোকে আর রান্না করতে হবেনা মেঘনা,বুয়া এসে রান্না করে যাবে।

বৃষ্টিঃ আপি বাকীসব কাজ ও কি বুয়া করবে? আপা বৃষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলো, -হুম,আমি খানিকটা ইতস্তত বোধ করলাম কারন বৃষ্টি আপাকে “আপা” থেকে “আপি”ডাকতে শুরু করেছে। আমি গ্লাস থেকে পানির ঢোক গিলতে গিলতে প্রশ্ন করলাম,-আপা তুই যে চাকরিটা করিস তাতে কি অনেক টাকা বেতন?

আপা হঠাৎ খাওয়া রেখে চুপ হয়ে গেলো,-আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন কেনো?
-এমনি এতো দ্রুত আমাদের জীবনের এতো পরিবর্তন হচ্ছে তাই জিজ্ঞাসা করলাম।বৃষ্টিঃএটা জাদুর শহর মেঘনা আপু,আমরা যদি আরো আগে মা’কে নিয়ে শহরে আসতাম তাহলে মা বিনা চিকিৎসায় মারা যেতোনা।মায়ের কথা বলতেই আপার চোখের কোনে পানি খেয়াল করলাম,খাবার শেষ না করেই সে হাত ধুতে ধুতে বললো,-মেঘনা ! বৃষ্টি ! খাবার সময় আর কখনো কথা বলবেনা তোমরা। বলেই নিজের রুমে চলে গেলো,আমি বৃষ্টির মাথায় হাত দিয়ে একটা খোঁচা দিয়ে বললাম,
-মায়ের কথা খাওয়ার সময় আপাকে মনে করানোর কি দরকার ছিলো?


Like it? Share with your friends!

0
1 share

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জাদুর শহর ১ম পর্ব

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles