ট্রেনের বগিতে পরিচয়


রাব্বানী রবি : শেষ বিকাল। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। রক্তিম সূর্য। শীতকাল। খুব দ্রুত সন্ধ্যা নামছে। একটা একটা ট্রেন আসছে। যাত্রী নামছে, উঠছে।আবার ট্রেন চলে যাচ্ছে,ধূলো উড়িয়ে ঠিক শেষ গন্তব্যে। এখন মানুষ চালাক হয়ে গেছে। নিজের জিনিশপত্র নিজেই বহন করে, ২০-৩০ টাকা বাছানোর আশায়।

ষ্ট্রেশনের গরম চা, খেতে খেতে, নিজ ট্রেনের অপেক্ষার প্রহর শেষই হচ্ছে না। ওদিকে,টুপ করে সূর্য নেমে আঁধারকে ডেকে দিয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছু ছবি তুললাম ষ্ট্রেশনের।

ওদিকে ৩নং প্ল্যাটফর্ম এ আমার গন্তব্যের ট্রেন নাকি আসছে কিছুক্ষণের মধ্যে।

ভূলে ২নং প্ল্যাটফর্ম এ দাঁড়িয়ে আছি। হাতের ব্যাগ রেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। একটা কাপল এসে পাশে দাঁড়ালো, হয়তো ভূলে।

কিছুক্ষণ পর, মেয়েটা কিছুক্ষণের জন্য একা হয়ে গেলো। হয়তো মেয়েটার কিছু আবদার পূরণ করতে ছেলেটা দোকানে গেলো ।

কেনো জানি মনে হচ্ছে, অচেনা মেয়েটি এবং আমি, এখন কাপল। একবারে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে। ইচ্ছা হলে হাত বাড়িয়ে, হাত ছুঁয়ে বলে দিতে পারি, ট্রেন থেকে নেমে, আমরা বাসায় ফিরবো রিকশায়।

আমি কি মেয়েটির দিকে ফিরে তাকাবো ! সেটা ভাবতে ভাবতে, ষ্ট্রেশনের মানুষ দেখছিলাম। তাদের মধ্যে অনেক উৎসুক জনতা হাঁটতে হাঁটতে দেখছে আমাদের। হয়তো ভাবছে, সদ্য বিবাহিত, কাপল। রোমাঞ্চ করতে, ছুটে চলেছে অজানায়।

আবার হয়তো কেউ ভাবছে, দুজনের সুখী পরিবার। আবার, হয়তো কেউ ভাবছে, কোলে একটা বাচ্চা থাকলে, সুখী পরিবার হতো।

হঠাৎ  ট্রেনের হুইসেল শুনে, হুশ ফিরলো। এবং ছেলেটি ও ফিরে এলো।

আমি ঞ বগিতে উঠে দেখি, আমার সিটে আরেকজন বসে আছে!

ভাই ২ সিট সামনে আমার সিট। বউ বাচ্চা নিয়ে একসাথে সিট পাই নি, তাই একসাথে এখানে বসলাম। একটু যদি কম্প্রোমাইজ করেন  প্লিজ।

আমি হাসি দিয়ে, ২ সিট পরে গিয়ে বসলাম। মাঝে মাঝে, কম্প্রোমাইজ করতে হয়, হয়তো ভবিষ্যতে কেউ আমার জন্য, আমার সুবিধের জন্য, কম্প্রোমাইজ নিয়ে বসে আছে।

ট্রেন ছেড়ে দিলো। হু হু করে শীতকালীন বাতাস ডুকছে খোলা জানালা দিয়ে। কানে হেডফোন লাগিয়ে  বিভিন্ন কালের বিভিন্ন গান, রেকর্ড করা শিল্প গেয়ে যাচ্ছে। গান শুনা, খোলা জানালা, সামনে অদূরে, একটা রুপবতী, পুরা বগির পরিবেশকে রোমান্টিক করে দিয়েছে।

ঠান্ডা হাওয়ার সাথে  গান শুনবো, আর সামনে একটু রুপবতীকে দেখবো।

আমার টার্গেট প্রথম কয়েকদফায় রুপবতীকে বুঝিয়ে দেওয়া আমি তার রুপ দেখে, বিমোহিত।

কোথায় যেনো পড়েছিলাম, কেউ যদি ১২ সেকেন্ড টানা একজনের দিকে তাকিয়ে থাকে, পলকবিহীন। তাহলে বুঝতে হবে,দর্শনদাতা প্রেমে পড়ছে।

আমি সেই থিউরীর দিকে আগালাম। ১২ সেকেন্ড নয়, চোখে পানি আসা পর্যন্ত পলকবিহীন তাকিয়ে রইলাম।

মেয়েদের দিকে প্রথম দফায় তাকিয়ে থাকলে, কোন দোষ হয় না। যখন আপনি টানা তাকিয়ে থাকবেন, তখন মেয়েটা আনইজি অনুভব করবে। ওড়না ঠিক করবে, জামা ঠিক আছে কিনা, পরখ করে দেখবে।

আমি মেয়েটাকে আরো আনইজি করার জন্য, হাত দেখিয়ে হায় সম্বোধন করে বসলাম। এবার সে আমাকে পরখ করার জন্য তাকিয়ে আছে আমার ই দিকে। আমি কি ভূল দেখছি, না ঠিকই দেখছি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটাকে আরো হেজিটেশনে ফেলার জন্য, ভেংচি কাটলাম। ভাবলাম, মেয়েটা ভয়ংকর কিছু করে বসবে বা আর তাকাবে না।

কিন্তুু, একবার সে তার মায়ের দিকে তাকালো। আমি দেখছি, তিনি জানালার দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে মগ্ন।

হয়তো তার মাকে বলবে, ওই ফাজিল ছেলেটা ভেংচি দিছে আমায়। আমি কিছুটা সংকোচে মনে কথা, সাজাতে লাগলাম, কি বলবো, যদি কমপ্লেইন আসে।

মেয়েটা ভেংচি দিয়ে দিলো, ফেরত। যেনো তার কাছে আমি টাকা পাই, টাকা ফিরত দিয়ে দিলো।

আমি ভেবাচেকা খেয়ে বসে আছি । আজ পর্যন্ত এরকম আমার সাথে কখনো ঘটে নি।

তাকিয়ে আছি, জানালার দিকে। আড়চোখে তাকিয়ো দেখছি, মেয়েটা কিছুক্ষণ পরপর তাকাচ্ছে।

আমার গন্তব্যে ট্রেন পৌছাইলো।আমি টেরই পেলাম না। পাশ দিয়ে মেয়েটা একটা ছোট কাগজ এগিয়ে না দিলে হয়তো, আজ অন্য গন্তব্যে পৌছে যেতাম।

মেয়েটার কথা ও ভুলে গেলাম, সে সাথে ভুলে গেলাম, ১১ ডিজিটের লেখা নাম্বারের কাজটির কথা।

দুদিন পর প্যান্ট ধুতে গিয়ে, পকেটে কিছু আছে কিনা দেখার জন্য, দেখি সেই কাগজটি।

সেদিন বিকেলে কাজ নেই দেখে, ছাদের টাংকিতে বসে লাগালাম ফোন। প্রথমে পুরুষ গলা শুনে কেটেই দিলো। ম্যাসেজে, নিজেকে যেভাবে, চিনানো যায়, সেভাবে লিখে দিলাম টেক্সট।

মিনিট পাঁচেক পর, কল ব্যাক পেলাম।

আরে একবছর আগে নাকি, এইরকমভাবে তাকে আমি ভেংচি দিছি  কোন ট্রেনে। আমি ভুলে গিয়েছি, কতো রকমের  ফাজলামি, পাগলামি তো প্রতিনিয়ত করেই যাই। সব কি মনে থাকে।

শায়লা, বললো, আমি ওই ছোট কাগজে আমার নাম্বার দিয়েছি, জানার জন্য, আমাকে দেখলেই কেনো ভেংচি দেন !

সে কেনো জানার জন্য, শায়লা আজ আমার বউ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেখানে দেখেছিলাম একটি কাপলকে,সেই ষ্ট্রেশনে ।

আজ কিন্তুু  আমি ওই ছেলেটির মতো ভূল করি নি। পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। একসময় বললাম, ষ্ট্রেশন থেকে নেমে আমরা কিন্তুু রিকশায় বাসায় ফিরবো…


Like it? Share with your friends!

0

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
1
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ট্রেনের বগিতে পরিচয়

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles