নানা পাটেকার: সাধারণের মধ্যেই যিনি অসাধারণ!

তিরাঙ্গা, রাজু বান গ্যায়া জেন্টেলম্যান, ক্রান্তিবীর, অগ্নিসাক্ষী, ওয়াজুদ, খামোশি, শক্তি- তার অভিনয়প্রতিভার জ্বলন্ত দলিল হয়ে আছে সিনেমাগুলো। ট্যাক্সি নাম্বার ৯২১১- এ


ডন উদয় শেঠির চরিত্রে তার দারুণ অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছিল মনে। এই মনে ভয় জাগাচ্ছেন, পরক্ষণেই আবার তাকে দেখে হাসতে হাসত গড়িয়ে পড়ছি; একটা চরিত্রেই সিরিয়াসনেস আর হিউমারের এমন দুর্দান্ত কম্বিনেশন চোখে লেগে ছিল অনেকদিন। তখন ভেবেছিলাম, নানা পাটেকার বোধহয় পর্দায় শুধু কমিক রোলই করেন। কিন্ত সেটা যে কত বড় ভুল ধারণা, আমার কল্পনাতেও ছিল না!
এই মানুষটাই ‘পারিন্দা’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের জন্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সেরা পার্শ্ব-অভিনেতা হিসেবে। সেই বছরের ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও গিয়েছিল তার ঘরেই। যারা পারিন্দা দেখেছেন, তারা জানেন সেই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আন্না শেঠরূপী নানা পাটেকারকে। ভয়ঙ্কর একটা চরিত্র, যার ভয়ে সবাই তটস্থ, অথচ আগুন দেখলেই যিনি নিজেই ভয়ে চিৎকার করতে থাকেন, আর নিজের মাথায় ক্রমাগত আঘাত করে যান! পুরস্কার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তার মন্তব্য ছিল- “নিজের মাথায় জোরে বাড়ি মারার জন্যে প্রথম জাতীয় পুরস্কার পেলাম, ভালো তো লাগবেই!”

বরাবরই ব্যতিক্রমী অভিনয় তিনি উপহার দিয়ে এসেছেন, একই ধরণের চরিত্রে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি কখনও। ভিলেন রোলই অনেকবার করেছেন, প্রতিবার নিজেকে ভেঙেছেন, নতুন অবতারে আবির্ভূত হয়েছেন পর্দায়। খলচরিত্রে ভিন্নতা নিয়ে এসেছেন, নায়ক না হয়েও অভিনয়ের দ্যুতিতে পর্দার সবটুকু রোশনাই টেনে নিয়েছেন নিজের দিকে। ‘প্রহার’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, সেই প্রশিক্ষণে তিনি এতটাই ভালো করেছিলেন যে, তাকে সম্মানসূচক ‘ক্যাপ্টেন’ র‍্যাংক দেয়া হয়েছিল সেনাবাহিনীতে! অভিনয় হোক কিংবা অন্যকিছু, ডেডিকেশনের জায়গাটায় তিনি নিজের দুইশো পার্সেন্ট দিয়ে এসেছেন বরাবরই। পারিন্দা’তে শেষদৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে আগুনে গায়ের চামড়া পুড়ে গিয়েছিল, কাউকে কিছু না বলেই শুটিং শেষ করেছিলেন তিনি, হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল দুই মাস!

তিরাঙ্গা, রাজু বান গ্যায়া জেন্টেলম্যান, ক্রান্তিবীর, অগ্নিসাক্ষী, ওয়াজুদ, খামোশি, শক্তি- তার অভিনয়প্রতিভার জ্বলন্ত দলিল হয়ে আছে সিনেমাগুলো। ট্যাক্সি নাম্বার ৯২১১- এর নানা পাটেকর অম্লান হয়ে আছেন দর্শকের মনে। ‘অপহরণ’ যারা দেখেছেন, তাদের কেউ কি তাবরেজ আলমকে ভুলতে পারবেন? অথবা ‘দ্য অ্যাটাকস অব ২৭/১১’ তে একটার পর একটা দুর্দান্ত ডায়লগ ডেলিভারি, সেই শীতল চাউনি- মনে গেঁথে থাকে একদম।

বলিউডে বচ্চন, খান বা কাপুরদের মতো স্টারডম নেই তার, সুপারস্টারদের তালিকা করলে তার নামটা আসে না কখনও, কিন্ত হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে প্রথমবার অভিনয়ের জন্যে কোটি রূপি পারিশ্রমিক হাঁকানো মানুষটার নাম নানা পাটেকার। নব্বইয়ের দশকে তাকে এই টাকা দিতে মুখিয়েও ছিলেন প্রযোজকেরা!

অথচ এই মানুষটা অভিনয়ে আসার আগে জীবন সংগ্রামে কাটিয়েছেন কত দীর্ঘ রজনী। রাতেরবেলা মুম্বাইয়ের সড়কে জেব্রা ক্রসিং আঁকতেন একটা সময়ে, তারপর সিনেমার পোস্টার আঁকা শুরু করলেন, এসব করে মাসে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ রূপি আয় হতো। সেটা দিয়েই পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতেন, থাকতেন ধারাভীর বস্তিতে। পরিশ্রম আর মেধার সম্মিলনে সাফল্য তার হাতে ধরা দিয়েছে, কিন্ত সেই সাফল্য তাকে মাটির মানুষ থেকে দূর আকাশের নক্ষত্র বানিয়ে দিতে পারেনি। তার জীবনটা তারকাদের মতো নয়। অতি সাধারণ একটা মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করেন তিনি, মুম্বাইয়ের একটা দুই রুমের ফ্ল্যাটে থাকেন নিজের মায়ের সঙ্গে। মাটিতে বসে খান, অষ্টব্যঞ্জনের উপস্থিতি থাকে না সেখানে।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে মানুষের কল্যানে তার করা কাজগুলো। গত ত্রিশ বছর ধরেই নিজের আয়ের প্রায় পুরোটাই মহারাষ্ট্রের গরিব মানুষদের জন্যে দান করে চলেছেন তিনি। খরার কবলে পড়ে সেখানে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা নিয়মিতই ঘটে সেখানে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে এমনই ১১২ টি পরিবার খুঁজে বের করেছিলেন নানা পাটেকার, প্রতিমাসে অল্প কিছু হলেও সাহায্য করেন তিনি সেইসব পরিবারকে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে প্রায় সাতশো কৃষক পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি, নিজের সামর্থ্যের মধ্যে চেষ্টা করেছেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর। একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরী করেছেন, এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রায় বাইশ কোটি রূপি ব্যয় করেছেন কৃষকদের উন্নয়নে।

বিহার ডুবে যায় বন্যায়, নানা পাটেকার ছুটে যান সেখানে, সাহায্য করেন তাদের। সীমান্তে জওয়ানেরা মারা যায়, নানা পাটেকার গিয়ে দাঁড়ান তাদের পরিবারের পাশে। স্বান্তনা দেন, আর্থিকভাবে সাহায্য করেন, সেই অসহায় মানুষগুলো জীবনের একটা বড় অবলম্বন খুঁজে পান নিজেদের পাশে, একটা বিশাল মহীরূহ হয়ে নানা পাটেকার ছায়া দিয়ে যান এইসব দূর্ঘটনাপীড়িত মানুষগুলোকে। প্রচার-প্রচারণাকে ঘৃণা করেন তিনি, বলেন- “আমার দানের কথা কাব্যিক ভাষায় না লিখে এই অসহায় মানুষগুলোর কথা লিখুন, ক্যামেরা বের না করে ওদের সাহায্য করুন!”
মাঝেমধ্যে দ্বিধায় পড়ে যাই, কে বেশী বড়? অভিনেতা নানা পাটেকার, নাকি মানুষ নানা পাটেকার? ওদের একজন আরেকজনকে ছাপিয়ে যাবার নেশায় মত্ত সারাক্ষণ, এই দুয়ের মাঝে পড়ে আমরা শুধু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে এই মানুষটাকে দেখতে থাকি, তার সৃষ্টিশীল কাজগুলো উপভোগ করতে থাকি নির্বাক দৃষ্টিতে। তিনি ইতিহাস গড়ে চলেন, নিজের পায়ের ছাপ রেখে যান চলার পথে, আর আমরা সাক্ষী হয়ে রই সেসবের!

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
1
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নানা পাটেকার: সাধারণের মধ্যেই যিনি অসাধারণ!

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles