নারীর আত্মকথা (ছোট গল্প)


Taimoor Mahmud Shomik:  বয়স চল্লিশ অতিক্রম করবার পর আমাকে নিয়ে বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনেরা হাসাহাসি শুরু করলো। এক বন্ধু একদিন বিয়ের দাওয়াতে সবার সামনে উচ্চস্বরে বলে বসলো আমাকে, চুল বাল পাকিয়ে ফেললি, এখনো বিয়ে করছিস না কেন রে? তোর দাঁড়ায় না নাকি !

অশ্লীল এবং বর্বরোচিত রসিকতায় বাঙ্গালির জুড়ি নেই। আমি তাকে ইংরেজিতে দ্যাটস নান অফ ইওর বিজনেস কথাটুকু যথাসম্ভব ভারি গলায় বলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে উৎসব ছেড়ে বেরিয়ে আসি। উঁচুদরের কোন রসিকতা করে ফেলেছে ভেবে তাল মিলিয়ে তারা পেছন থেকে খুব হেসেছিলো, মনে আছে।

কই? ভালোই তো আছি। অতিরিক্তরকম স্বাধীনচেতা বলেই বোধহয় এক নারীর সাথে বাকি জীবনের জন্য সাতপাকে নিজেকে বাঁধতে পারিনি। বিশ্বাস করুন, আমার দাঁড়াতো ! ইনফ্যাক্ট… এখনো দাঁড়ায়। প্রাক্তন প্রেমিকাদের যেমন সুমি, তাহমিনা আর জবাকে জিজ্ঞেস করলেই আপনারা সেটার উত্তর পেয়ে যাবেন। মা খুব বলতো, এই যে ঘন ঘন নারী বদলাচ্ছিস, পাপ হচ্ছে… জীবন সায়াহ্নে গিয়ে হিসেব মেলাতে পারবি তো? শুনে আমি প্রাচীনপন্থি মায়ের মুখের বলিরেখার দিকে তাকিয়ে নরম করে হাসতাম।

আজকাল সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হাঁপ ধরে যায়। মাথার চুল কিছু পেকেছে। বন্ধুদের বাড়ি গেলে তাদের বউ যদি অতিরিক্তরকম হেসে কথা বলে, খেয়াল করে দেখেছি বন্ধুর মুখের রঙ পরিবর্তন হয়। যেন মুখ ফুটে বলতে পারছেনা, ব্যাচেলর আধবুড়োটার সাথে অতো কি রঙঢঙ তোমার শুনি? চট করে মনটা খারাপ করে যায় আমার বুঝতে পারি। বারে বসা হয় প্রায় রাতেই। নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য অ্যালকোহল বন্ধুর মতো। খাই টাই। বাদাম, বরফ কুচির সাথে। মাঝে পুলিশের ভেজাল হয়েছিলো বলে এক দরাজ হৃদয়ের বন্ধু নিজে থেকেই দৌড়াদৌড়ি করে আমাকে মদ খাবার লাইসেন্স করে দিলো।

বাবা বেশ কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলো ব্যাংকে। প্রোডিউস করি এটা সেটা। আজ একক নাটক তো কাল ধারাবাহিক। ভালোই লাভ থাকে। উচ্চাকাঙ্খী উঠতি অভিনেত্রীরা ঘরে আসে। কেউ ওড়না ফেলে দেয়। কেউ শাড়ির আঁচল। না করতে পারিনা। আবার খুব যে উৎসুক হয়ে উঠি তাও কিন্তু না ! সোফায় বসে বোয়াল মাছের মতো নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকি। তারপর সিগারেট জ্বেলে শর্টকাট কথাবার্তায় নিয়ে যাই বেডরুমে। ওসব আহ্লাদি কথা আমার আগে থেকেই অপছন্দ। আরে বাবা দুনিয়া তো চলছে নিখুঁত দেয়া নেয়ার উপরে… নাকি ! কাজ সেরে ট্রান্সপোর্ট সুবিধা দেই। রাত যতোই হোক যার যেখানে নিবাস ড্রাইভার তাকে নামিয়ে দেয় সেখানে।

প্রোডিউসার বলে আমার রুচি খারাপ তা কিন্তু না। ভালো সিনেমা দেখি। বই পড়ি। কমোডের মুখোমুখি টাঙ্গানো আছে রবীন্দ্রনাথ। টাকা ঢেলে বাথরুমে সাউন্ড সিস্টেম বসিয়েছি। রবীন্দ্রনাথের মুখের উপর ম্যারুন ফাইভ চলতে থাকে। সপ্তাহে দুদিন বাজার করি। ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হয়। আজকাল প্রেশারটা ফ্লাকচুয়েট করে। লো আর হাইয়ের চক্করে আমার অস্তিত্বই গেছে সঙ্কটে পড়ে। ডাক্তার না জেনে বেকুবের মতো বলেছে, ভাবীর সাথে একদম ঝগড়া করবেন না। তাকে নিয়ে বরং সুযোগ পেলেই হলে নিয়ে গিয়ে হালকা রসিকতার সিনেমা দেখবেন। শুনে আমার মুখে এসে গিয়েছিলো, তোর কামুক বউকে ধার দিলে যেতে পারি রে বাঞ্চোত !

আজকাল অবসর সময়ে ছবি আঁকি। ভালো হোটেলে সাঁতার কাটি। সাইকেল কিনেছি শরীরটা ঠিক রাখবার জন্য। ইয়োগা করিয়ে যায় প্রশিক্ষক বাসায় এসে। বারান্দায় লাগিয়েছি গাছ। জল দেই। একদিন খুব মেজাজ বিগড়েছিলো। সেখানে মূত্র বিসর্জন করেছি। তারপর গভীর রাতে গাছকে এসে সরি বলেছি। আমার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে, কেউ খুব শাসন করুক। রাতে মমতা নিয়ে দুটো আইটেম রাঁধলে একটাতে লবণ কম দিক। ঝগড়া করবো। রাগের মাথায় বালিশ ছুড়ে মারবো। কেউ আমাকে মদ খেতে বারণ না করলেও পরামর্শ দিক, দু পেগ কমিয়ে তো খেতে পারো; সজ্ঞানে ব্যালকনিতে আমার সাথে বসে চাঁদ দেখতে আর তেমন অসুবিধে হবেনা !

বাঙালি ভাবে বিয়ে করতে বুঝি টাকা লাগে। সবাই তো আর এক না। যার সূক্ষ্ম রুচি, তার এই কাজ করতে লাগে মন। আমি নিঃসঙ্গতাকে ভালোবেসে এক বিচিত্র পারভার্টনেস নিজের ভেতর স্টাব্লিশ করে দিনের পর দিন সত্তাকে পোড়াচ্ছি। পেছন থেকে অনেককেই বলতে শুনি, আমাকে নারীলিপ্সু বলছে। বানিয়ে বানিয়ে গল্প ফাঁদছে। অথচ কোন মেয়েকে আমি ফাঁদে ফেলিনি। জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আদেশ দেইনি… এবার কাপড় খোলো সোনা ! তারা নিজ স্বার্থে এসে মার্জিতভাবে নিজেকে সঁপে দিয়ে ক্যারিয়ার রাঙ্গাবার ডাকটিকিট মুঠোয় ভরে চলে গেছে যার যার অবস্থানে।

সেদিন কাজের বুয়া রহিমা বললো, আপনে একটা বিয়া করেন স্যার। ষাটোর্ধ্ব রহিমার বড় শখ, আমার বউয়ের মুখদর্শন করে হাসিমুখে পান চাবাতে চাবাতে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে নিজ গ্রামে নির্বাসনে যাবে। আমি শুনে হাসি। মাও ঠিক এই কথাই বলতো। তার নিজের মতো করে। একমাত্র ছেলে হওয়ায় একপ্রকার অভিমান নিয়েই আকাশের ওপারে দ্বিতীয় জীবন সে শুরু করেছিলো। আত্মীয়েরা আছে যে যার মতো। আমিই যোগাযোগ রাখিনি। তাদের গবেষণার বস্তু হয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিলো না।

তারপর একদিন হৃদরোগে শয্যাশায়ী হই। দু বছরে বয়স বেড়ে যায় দশ বছরের মতো। রহিমার মায়ের চোখ উপচে পড়া জল দেখে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিলো। সুস্থ হই ধীরে। কিন্তু আগের সেই জোরটা পাইনা। মন নরম হয়ে আসে। শিভাস রিগ্যালেও ধরে অরুচি। নবাগতারা আসা কমিয়ে দেয় একেবারে। ফোন দিয়ে খোঁজও নেয়নি আর কেউ। অথচ আমার অবদান ছিলো তাদের জাতে ওঠাতে। ডাক্তারের শত অনুরোধ সত্ত্বেও আমি কয়েকমাস বিরতি দিয়ে সন্ধ্যার পর বোতল খুলে বসি। সাদাকালো সময়ের কথা, স্মৃতি আর ছবি একের পর এক চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে। সে রাতে হৃদয়ের রোগটা দ্বিতীয়বার শরীরে হানা দেবার আগ মুহূর্তে দেখতে পাই, রাস্তায় নির্জনে একটা কুকুর বুকে গভীর অভিমান নিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর একটা মানুষও তাকে নুন্যতম পরিমাণ বুঝলোনা বলে।


Like it? Share with your friends!

0
3 shares

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নারীর আত্মকথা (ছোট গল্প)

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles