বর্ষার গান ও রবি ঠাকুর


মিনহাজ হোসাইন :

বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যের দিকপাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐশ্বরিক প্রেম উপলব্ধি লৌকিকতার মাঝেও ভিন্ন স্বাদ আস্বাদন করায় মানুষকে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-‘আমার মধ্যে আমার অন্তর্দেবতার একটি প্রকাশের আনন্দ রহিয়াছে। সেই আনন্দ, সেই প্রেম, আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আমার বুদ্ধি-মন, আমার নিকট প্রত্যক্ষ এই বিশ্বজগৎ, আমার অনাদি, অতীত ও অনন্ত ভবিষ্যৎ পরিপ্লুত করিয়া আছে। এ লীলা তো আমি কিছুই বুঝি না, কিন্তু আমার মধ্যেই নিয়ত এই এক প্রেমের লীলা।’

কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো ছোট গল্পে বা উপন্যাসে প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে নানা আঙ্গিকে। প্রকৃতি প্রেম, ঈশ্বর প্রেম, মানব প্রেম, স্বদেশ প্রেম যেন এক সুতোয় গাঁথা। রবীন্দ্রনাথের প্রেমের ভাব প্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম তাঁর গান। রবীন্দ্রনাথের কথায়,’ আমাদের ভাব প্রকাশের দুটি উপকরণ-কথা ও সুর। কথা যতখানি ভাব প্রকাশে সমর্থ, সুরও প্রায় ততটাই ভাব প্রকাশ করে। সংগীত ও কবিতা ভাব প্রকাশের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়েছে।’ অপরূপ প্রকৃতির বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের রচনায় বাংলাদেশের নদ-নদীর বর্ণনা যেমন এসেছে,ঋতু বৈচিত্র্যের কথাও এসেছে। রবীন্দ্রনাথের গানে ঋতুর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। গীতবিতানের প্রকৃতি পর্যায়ের গানের সংখ্যা ২৮৩, তন্মধ্যে বর্ষা নিয়ে গানের সংখ্যা ১১৫। বর্ষার প্রভাব বর্ণনে রবীন্দ্রনাথ ১৩২১ বঙ্গাব্দে ‘ আষাঢ়’ প্রবন্ধে বলেছেন,‘ ভারতবর্ষের প্রত্যেক ঋতুরই একটা না- একটা উৎসব আছে। কিন্তু কোন ঋতু যে নিতান্ত বিনা কারণে তাহার হৃদয় অধিকার করিয়াছে তাহা যদি দেখিতে চাও তবে সঙ্গীতের মধ্যে সন্ধান করো। কেন না, সংগীতেই হৃদয়ের ভিতরকার কথাটা ফাঁস হইয়া পড়ে। বলিতে গেলে ঋতুর রাগরাগিণী কেবল বর্ষার আছে আর বসন্তের। সংগীতশাস্ত্রের মধ্যে সকল ঋতুরই জন্য কিছু কিছু সুরের বরাদ্দ থাকা সম্ভব, কিন্তু সেটা কেবল শাস্ত্রগত। ব্যবহারে দেখিতে পাই, বসন্তের জন্য আছে বসন্ত আর বাহার; আর বর্ষার জন্য মেঘ, মল্লার, দেশ এবং আরো বিস্তর। সংগীতের পাড়ায় ভোট লইলে, বর্ষারই হয় জিত।’ জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরে রবীন্দ্রনাথ মাত্র সাতটি বর্ষার গান রচনা করেছেন,চল্লিশ থেকে ষাট বছর বয়সে তিনি রচনা করেছেন ১৭ টি বর্ষার গান।

জীবনের শেষ বিশ বছরে তিঁনি রচনা করেন আরো ৮৮টি গান। এর পেছনে কারণও আছে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার ২১ বছরের মাথায় ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২৭ শ্রাবণ প্রথম শান্তিনিকেতনে বর্ষামঙ্গল পালন করেন। বর্ষা মঙ্গল উদযাপনের প্রধান অনুষঙ্গই ছিল বর্ষার গান। এছাড়াও শান্তিনিকেতনের বাইরে কলকাতায় ঐ একই বছরের ১৭ ও ১৮ ভাদ্র বর্ষা মঙ্গল পালিত হয় রবীন্দ্রনাথের পরিচালনায়।প্রতিবছর বর্ষা মঙ্গল পালনের উদ্দেশ্যে বর্ষার গান রচনা করতেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৯ সালের বর্ষা রবীন্দ্রনাথের জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ ঐ বছর রবীন্দ্রনাথ সর্বোচ্চ ১৬ টি বর্ষার গান রচনা করেছেন। বর্ষা মঙ্গল উদযাপনের জন্যে রবীন্দ্রনাথের সর্বশেষ বর্ষার গান ‘এসো এসো ওগো শ্যামল ছায়াঘন দিন।’প্রথম বর্ষা মঙ্গল অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ নিজেই গান করেছিলেন, সবশেষ বর্ষা মঙ্গল অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ করেন। রবীন্দ্রনাথের শুরুর দিকের বর্ষার গানগুলো ছিলো মল্লার বা মিশ্র মল্লার রাগের।পরবর্তীতে তিঁনি বর্ষার গানে ইমন বা ইমনকল্যাণ, সিন্ধু বা সিন্ধুকাফি, ভূপালী, বেহাগ, ভৈরবী ইত্যাদি রাগ ব্যবহার করেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক বর্ষার গান নাটকের প্রয়োজনে রচিত, যেমন- চণ্ডালিকার জন্য রচনা করেন ‘ হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’, অচলায়তনের জন্য রচিত হয় ‘ উতল-ধারা বাদল ঝরে’ ও রবীন্দ্রনাথ রচিত শেষ বর্ষণ নাটকের ২৪ টি গানের মধ্যে ১৩ টিই বর্ষার গান। আবার রবীন্দ্রনাথ পনের বছর বয়সে প্রথম বর্ষার গান ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ রচনা করেন।রবীন্দ্রনাথের বর্ষা নিয়ে সর্বশেষ রচিত গান ‘শ্রাবণের বারিধারা বহিছে বিরামহারা’।

রবীন্দ্রনাথ কিছু কিছু বর্ষার গানকে কবিতায় রূপান্তর করেছেন, যেমন,মূলভাব ঠিক রেখে ‘ যদি হায় জীবন পূরণ নাই হল মম’, ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’,’বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ ও ‘এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে ‘গানগুলো রূপান্তরিত হয় যথাক্রমে উদবৃত্ত, আধোজাগো, দেওয়া নেওয়া ও যাবার আগে কবিতায়। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার কবিতায় যেমন আছে বর্ষা প্রকৃতির আগমনী বার্তা, প্রকৃতির বর্ণন, বিরহের রূপ, তেমনি বর্ষা নিয়ে আছে পূজা পর্বের গান। পূজা পর্বের বর্ষার গানগুলো সংকলিত আছে গীতাঞ্জলিতে। রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে সামাজিক বোধ থেকে দেখেছেন, তাই তাঁর প্রেমের সংজ্ঞায় বিরহকে আলাদা করেননি। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার গানে বিরহের, বাৎসল্যের গুরুত্বকে বর্ণন করেছেন এভাবে ‘বর্ষাকাল তোমাকে তোমার বাঞ্চিত হিত অর্পণ করুক।

বর্ষাকাল তো সুখের জন্য নহে, ইহা মঙ্গলের জন্য। বর্ষাকালে উপভোগের বাসনা হয় না,”স্বয়ং” -এর মধ্যে একটা অভাব অনুভব হয়,একটা অনির্দেশ্য বাঞ্চা জন্মে।’বর্ষা বরণের সামগ্রিকতায় রবীন্দ্রনাথ চির প্রাসঙ্গিক।রবীন্দ্রনাথের অনুভবে বর্ষার গভীরতা ও বিচিত্রতা প্রেমের নির্মল মানস গঠনে শুদ্ধরূপ ও শ্বাশ্বত।

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বর্ষার গান ও রবি ঠাকুর

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles