বহতা জীবন অনুভূতি

লাশকে কখনো মানুষের মত করে আচরন করা হয় না। সে বিছানায় সারাটা জীবন মানুষ কাটায় মরে গেলে তাকে সে বিছানাতেও রাখে না। লাশকে যে খাটিয়ায় শোয়াতে হয়। ঘরে বেশিক্ষন রাখে না। গো


লিখেছেন   Maruf Khan

ভর দুপুর, কিশোর রহিম মিয়া বসে আছে ঘরে, বিষণ্ণতায় জালানার বাহিরে তাকিয়ে। কেন যেন জীবনটাকে তার বেশিই বিষাদময় মনে হচ্ছে। হয়তো মাঘ মাসের শেষে পৌষের হালকা শীতল হাওয়া জানালার পাশের গাছটাকে নাড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করায় এমন মন খারাপের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। বাতাস তাপমাত্রা আলোছায়ার সাথে মনের অবস্থার কি যেন একটা সম্পর্ক আছে। একেক রকম আবহাওয়া একেক ধরনের মনের অবস্থা তৈরি করে। তার সম্বিত ফিরলো ভুনা মাংসের ঘ্রাণে। ভুনা মাংস তার সবচেয়ে প্রিয়। মা রান্না করে বাটিতে বেড়ে রাখছে তাই এত ঘ্রাণ ছড়িয়ে সারা ঘরে ভরে গেছে। তার বেখেয়ালি মনোভাবের জন্য একটু আগে মা বকাবকি করে গিয়েছে। অথচ তার দোষ নেই। কেন যেন কিছুই ভালো লাগে না মন বসাতে। মা ব্যাপারটা বুঝতেও চায় না। মা একটু আগেও রান্নাঘর থেকে একাই বকে যাচ্ছিলো। কিন্তু এমন মৃদু ঠান্ডা হাওয়ায় সে অন্যমনস্ক হয়ে কিছুই খেয়াল করেনি। মা খাবার দিয়ে গেলো এবং নিজের সাথে একা একা সে কথা বলে যাচ্ছে, ঠিক কথা না রহিম মিয়ার বেখেয়ালি আচরণ শুধরানোর জন্য অভিযোগ বলে যাচ্ছে। মন খারাপের সাথে খাওয়াদাওয়ার কি যেন একটা সম্পর্ক আছে। পেট ভরে প্রিয় খাবার খেলে মন বদলে যায়। কেমন যেন সুখ সুখ অনুভূতি কাজ করে। তার মনে হচ্ছিলো এই জীবন সংসার দায়িত্ববোধ থেকে যদি মুক্তি পাওয়া যেত। মরে গেলেই বোধহয় সব কিছু থেকে মুক্তি মিলবে। আঙুল চালিয়ে দিয়ে ভুনা মাংস ভাতের সাথে মাখিয়েই সব ভাবনা উড়ে গেলো। দুনিয়াতে ভুনা মাংস ছাড়া আর সব কিছুই মিথ্যে এখন তার কাছে। কিন্তু হঠাৎ হতভম্ব হয়ে গেলো সে, খাবারের কোন স্বাদ পাচ্ছে না। এমন কেন হলো বুঝতেও পারছে না। তার হাতটা মুখের কাছ থেকে টেবিলে পড়ে গেলো। হাত পা ভারী হয়ে গেছে, নাড়াতে পারছে না। এক ভয়ানক আতংকিত অনুভূতি। দূর থেকে কে যেন বাবা বলে ডাকছে, কিন্তু কন্ঠটা মায়ের না তবুও খুব পরিচিত। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেও পারছে না। খুবই জঘন্য অবশ অনূভূতি।

রিয়াজ, রহিম মিয়ার বড় ছেলে, তার বাবার মুখ ধরে ডেকে ডেকে ঝাকাচ্ছে আর বাবা বলে ডাকছে। তার বাবা অনেকদিন ধরে অসুস্থ, বয়সও হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছে ক্যান্সার, ছড়িয়ে গেছে আশেপাশে, বাঁচবে না। তার বয়সী শরীর আর সংগ্রাম করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বুকের মধ্যে কেমন যেন চিনচিনে ব্যাথা তবুও পাহড়ের মত শক্ত হয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। বাবা তার একমাত্র সম্বল, সে বড় ছেলে, তাকেই হাল ধরতে হবে। কিন্তু এতবড় দায়িত্ববোধ নিজের কাঁধে নেবার জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত না। এদিকে জেরিন নামে তার এক সমবয়সী বান্ধবীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক। মেয়েটাকে বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু ভালোবাসার কমতি না থাকা সত্বেও তার পক্ষে নিজে বেকার এবং অসুস্থ বাবা রেখে তার বিয়ে করাও সম্ভব না। মেয়েটাও বিয়ে বোধহয় আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। দুই এক মাসের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যাবে। একা একটা মেয়ে কখনোই পরিবারের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল আর চাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সহজে টিকতে পারে না। এক সময় নিশ্চুপ দুচোখে অঝোর পানি ছেড়ে দিয়ে হার মেনে নেয়। মনের মধ্যে ভালোবাসাটা হারায় না কিন্তু তাও অন্য পুরুষের সাথে ঘর করা আরাম্ভ করে, ভালোবাসে বাচ্চাকাচ্চা নেয়, কিন্তু মনের গহীনে এক অব্যবহৃত ধুলো জমা চিলেকোঠায় পুরোনো ভালোবাসার জন্য ধূলো জমা স্থান আজীবনই রেখে দেয়।

রহিম মিয়া চোখ খুলে তাকালো। তার ছেলের চোখ, ঠিক তার মতই দেখতে। কালশিটে দাগ পড়েছে। লাল আর মলিন সে দুটো চোখ। তার খুবই খারাপ লাগছে যে চোখে খুশির ভাষা দেখার জন্য তার এ জীবনের সংগ্রাম, সেই চোখে আজ তার নিজের জীবন সংগ্রামের কাছে পরাস্থ হতে বসায় এই মলিনতা। হাত পা শক্তিহীন নাড়াতে পারে না। স্বপ্নের ঘোরে ছিলো সে। তাই খাবারের স্বাদ অনুভব করতে পারছিলো না। সে টের পাচ্ছে তার শরীরের সমস্ত অঙ্গ জোর করে সংগ্রাম করে মুমূর্ষু ভাবে টিকে আছে। যেকোন মুহূর্তে সব বন্ধ হয়ে যাবে। মরে যাবার আগে নাকি মনের কোনে লুকিয়ে থাকা পুরোনো স্মৃতিরা জেগে ওঠে। আচ্ছা সে কি মারা যাচ্ছে! অবাক হয়ে ভাবতে থাকে সে। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। বুকের মাঝে হৃদপিন্ডটাও খুব দুর্বল হয়ে অনিয়ন্ত্রিত বীট দিচ্ছে। হঠাৎ আশেপাশের মানুষের কথা আর আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসার মত শোনা যাচ্ছে। মাথাটা খুবই ভারী অনুভব হচ্ছে। যেন কেও মাথায় একটা চালের বস্তা চাপিয়ে দেয়ার মত। তাই চোখ নাড়াতে পারছে না, কথা বলতে পারছে না। হঠাৎ বুকে একটা ঝাকুনি দিয়ে স্পন্দন থেমে গেলো। সারা শরীরে প্রচন্ড চাপ কয়েক মন ওজন বেড়ে যাবার মত। লোডশেডিং এর মত চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেলো মুহূর্তে। চার পাশের আওয়াজ আর দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে অন্ধকার তলাহীন এক কুয়ার মাঝে সে পড়ে যাচ্ছে। এরপর শুধুই শূন্যতা।

রিয়াজ, রিয়াজের মা সহ পরিবারের অন্যরা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। মানুষ বড়ই বিচিত্র প্রানী। জন্মের পর থেকে বড় হয়ে অচেনা একটা মানুষ খুব চেনা হয়ে একসাথে বাঁচাটা জীবন। আর বিচিত্র এই মায়া নামের অনুভূতি। এই অনুভূতিতে আবদ্ধ মানুষের জন্য ক্ষুধা তৃষ্মা সকল মানবীয় মৌলিক তাড়না ম্লান হয়ে যায়। মরে যেতেও ইচ্ছে হয়। মানুষ যতক্ষণ বেঁচে থাকে ততক্ষণ সে মানুষ। মরে গেলেই লাশ। লাশকে কখনো মানুষের মত করে আচরন করা হয় না। সে বিছানায় সারাটা জীবন মানুষ কাটায় মরে গেলে তাকে সে বিছানাতেও রাখে না। লাশকে যে খাটিয়ায় শোয়াতে হয়। ঘরে বেশিক্ষন রাখে না। গোসল করিয়ে, আগরবাতি গোলাপজল কর্পূর ছড়িয়ে কাফনে পেঁচায়। মন মত জামা না হলে মানুষ তা গায়ে দেয় না। নরম বালিশ না হলে মাথায় দেয়না। তোষক নরম না হলে শুতে পারে না। কিন্তু সব লাশকে একই রকম কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে, শক্ত খাটিয়ায় বালিশ ছাড়া শুইয়ে রাখে। লাশ বেশিক্ষণ রাখার নিয়ম নেই। দ্রুত দাফন করতে হয়। অন্ধকার মাটির ঘর। আলো নেই, আসবাবপত্র নেই, আভিজাত্যহীন অন্ধকার মাটির ঘর। পোকায় খেয়ে মাংস গলে মাটির সাথে মিশে যায়। হাড়গুলো শুধু এই ক্ষুদ্র কিন্তু আপাতত বিশাল কবরে প্রকান্ড দুনিয়ার ছোট এক জায়গায় পড়ে থাকে। তবুও মানুষের বেঁচে থাকতে এত অহমিকা আর অসীম চাহিদা।

শাহীন, ইন্টার্ন ডাক্তার, টানা দিনের পর দিন ডিউটির ধকল শরীর সামলে নিতে পারছে না। কত রাত যে একটু শান্তিতে ঘুমোতে পারেনি তা মনেও করতে পারে না। ঠিকমত না ঘুমাতে ঘুমাতে মন মেজাজ খিটমিটে হয়ে থাকে। সেও পরিবারের বড় ছেলে। সামনে বোনের বিয়ে, পরিবারের হাল ধরতে হবে। বোনকেও বিয়ে দিতে হবে। সে ডাক্তার তাই পরিবারের সবাই তার প্রতি অপরিসীম প্রত্যাশা নিয়ে আছে। এদিকে ক্লাসমেট এক বান্ধবীর সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিলো তার। মনে মনে তাকে খুবই পছন্দ করতো কিন্তু কখনোই প্রকাশ করেনি। গত তিনদিন আগে তার বিয়ে হয়ে গেছে এক প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারের সাথে। মনটা খুবই ভারাক্রান্ত আর বিষাদময়। কোন কিছুতেই মন দিয়ে সামলে চলতে পারছে না। দরজায় দৌড়ে এক পেশেন্টের এটেন্ডেন্ট এলো। বললো ১১ নম্বর বেডের রোগীর অবস্থা নাকি খারাপ, জলদি যেতে হবে। বিষন্ন মন নিয়ে সে বললো আসছি বলে তাকে যেতে বললো। ধীরেসুস্থে জিনিসপত্র নিয়ে উঠে যেতে কয়েকমিনিট দেরি হলো। বেডের পাশে গিয়ে রোগীকে দেখে বুঝলো রোগী মারা গেছে। দুনিয়াতে কোন শারীরিক পরিশ্রমের কাজও সয়ে করা যায় কিন্তু ডেথ ডিক্লেয়ারেশন এর মত কঠিন কাজ করা আসলেও দুঃসহ। তার শুধু দুটো শব্দ উচ্চারনেই একটা পরিবার মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়বে। মানসিকভাবে ব্যাপারটা দুরহ। সে ডেথ ডিক্লেয়ারেশন করলো আনুষঙ্গিক এক্সামিনেশন গুলো করার পর। কয়েক মিনিট দেরি হলো কেন আসতে এ ব্যাপারটা তখন পেশেন্টের বড় ছেলে মানতে পারলো না। যদিও কিছুই করার ছিলো না। কিন্তু এমন মুহূর্তে এমন প্রবল মানসিক চাপ না সামলাতে পেড়ে অনেকেই হিতাহিত বোধ হারিয়ে ফেলে। সেই ছেলেটা শাহীনে কলার ধরে চিৎকার করে উঠলো। সাথে সাথে ওয়ার্ডবয় সহ অন্যান্য কলিগেরা এসে সেই ছেলেকে ধরে ফেললো। শাহীনের সারা শরীর রাগে গরম হয়ে গেছে। এই বাংলাদেশে কাজ করার পরিবেশ নেই সে আগেই বলতো। এখন এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে মেজাজ তার আরও চড়ে গেছে। পেশেন্ট পার্টি বনাম হাসপাতালের লোকজনের মধ্যে একটা উত্তপ্ত পরিস্থিতি। তবে পেশেন্ট পার্টি অন্য বয়স্ক লোকেরা এসে ক্ষমা চাইলো। ক্ষমা চাইলেই কি আর এমন বিদঘুটে অভিজ্ঞতার দাগ মন থেকে মুছে যায় না। রাগে গজ গজ করতে করতে শাহীন আবার রুমে এসে বসলো। সবাই তাকে ঘিরে এটাসেটা বলে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

রিয়াজের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে বাবাকে হারিয়ে ফেলায় তার মাথা কাজ করছে না। কিভাবে সামলাবে এই পরিবার। কিভাবে কোথা থেকে আসবে টাকা। কিছুই ভাবতে পারছেনা সে। এদিকে জমিজমা নিয়ে আত্নীয়দের সাথে বিরোধ। বাবা মারা যাওয়ায় বাকিদের কিভাবে সামলাবে সে ভেবে পাচ্ছে না। বাবাকে নিয়ে যেতে হবে গ্রামের বাড়ি সেখানেই হবে দাফন। এত চাপ মাথায় সে দাড়াতে পারছে না। পা গুলো যেন বিদ্রোহ করছে হাল ছেড়ে দিয়ে শিথিল হয়ে যাওয়ার মত। জীবন রঙিন কিন্তু বাস্তবতার ক্যানভাসে তা বড়ই মলিন আর নিষ্ঠুর। বুকের মাঝে বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর মত। কতশত ঘাত প্রতিঘাতের ঝর্ণার পানি পাহাড়ের মত শক্ত দৃঢ় মানসিকতার মানুষের ভেতরে চোখের অলক্ষ্যে ঝরে পরে এবং অবিরাম বয়ে মিশে যায় জীবন সমুদ্রে। শুধু ভিন্ন ভিন্ন মানুষে সংগ্রাম ভিন্ন ভিন্ন। তবু অনুভূতিটা অভিন্ন।

  1. 1



Like it? Share with your friends!

0
4 shares

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
1
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বহতা জীবন অনুভূতি

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles