বাংলার নৈসর্গিক কবি


কামরুল নাজিম : 

বাংলা সাহিত্যের নিঁখাদ বিশুদ্ধতম কবির জন্মদিন আজ।

চর্যাপদ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলা কবিতার জগতে প্রবেশ ঘটেছে হাজারো কবির। এঁদের প্রায় সকলেই যুগের সৃষ্টি। মাইকেল মধুসুধন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুলের পরে বাংলা কবিতায় জীবনানন্দকেই সম্ভবত প্রধানতম যুগস্রষ্টা কবির আখ্যা দেয়া যায়।

জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল প্রতিভার নাম। আধুনিক বাংলা কবিতা যখন প্রায় সর্বাংসে রবীন্দ্রময়, ঠিক তখনই এক অভিনব আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে বাংলা কাব্যের জগতে প্রবেশ করলেন জীবনানন্দ দাশ। সাথে নিলেন ‘পঞ্চপান্ডব’ এর খেতাবধারী বাকী চারজনকে। এঁরা হলেন বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০), বিষ্ণু দে (১৯০৯-৮২) ও অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-৮৬)।

কেবল কবি নন; জীবনানন্দ দাশ একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। এছাড়া তিনি ছবিও আঁকতেন। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা এ পর্যন্ত ছয়টি। আর একটি অভাবনীয় বিষয় হলো জীবনানন্দের লেখা গল্পের সংখ্যা প্রচুর। অনেকের কাছে বিষয়টি একেবারেই জ্ঞাত নয়। তাঁর ছিয়াশিটি ছোটগল্প ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তথাপি তিনি মূলত কবি হিসেবেই ব্যাপক সমাদৃত। এখন পর্যন্ত তার গ্রন্থিত কবিতার সংখ্যা ছয়শ’ এর অধিক। অথচ মাত্র ‘একশত বাষট্টিটি’ কবিতা তাঁর জীবদ্দশায় গ্রন্থিত হয়েছিল।

‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়েই বাংলা কবিতার আকাশে উদিত হন জীবনানন্দ দাশ। ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬) তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ হলেও মাঝে ব্যবধান নয় বছরের। এ সময়ে কবি কি লিখেছেন কিংবা আদৌ লিখেছেন কিনা তার হদিস মেলে না। তবে এ সময়ে তিনি কিছু লিখেন নি এটি হতে পারে না। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন জাত-প্রতিভা। নয় বছর হাত গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র তিনি নন। ধারণা করা হয় মৃত্যুর পর প্রকাশিত কবির ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সমূহের অনেকগুলো রচনাই এ সময়ের।

জীবনানন্দের হাত ধরেই বাংলা কবিতার ধারায় গদ্য কবিতার প্রবেশ ঘটেছিল। বিদ্যাসাগর গদ্যের মধ্যে ছন্দ আবিষ্কার করলেন। আর জীবনানন্দ ছন্দের কাঠামোয় ঢেলে দিলেন গদ্যের তরল কোমল দেহকে। বাংলা কবিতা পেল নতুন মাত্রা।

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং একই সঙ্গে শিক্ষক হওয়ায় পাশ্চাত্য সাহিত্য সম্পর্কেও জীবনানন্দের ব্যাপক জানাশোনা ছিল। জানার সুযোগের সাথে যোগ হল জানার অদম্য স্পৃহা। বাংলা সাহিত্যে  জীবনানন্দ দাশ কেবল ‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন, এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলেন না। তিনি অন্যকেও দেখালেন কিভাবে জয়ী হতে হয়। রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত তিনি দেখালেন গদ্য কবিতার পথ। প্রভাব বিস্তার করলেন রবীন্দ্রনাথের কবি-চৈতন্যে। বাংলা সাহিত্যে এ এক অভাবনীয় ঘটনা।

জীবনানন্দ দাশের বিচরণের মূল ক্ষেত্র ছিল বাংলার নৈসর্গিক সৌন্দয্যে। তাঁর সমধিক পরিচিতি ‘রুপসী বাংলার কবি’ হিসেবে। বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে বলেছিলেন ‘প্রকৃত কবি এবং প্রকৃতির কবি।’ প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই যেন কেবল তাঁকে ডেকেছে। জীবনানন্দের প্রকৃতির প্রকৃতি প্রচলিত ধারার হলেও উপস্থাপনার ঢঙ্গের কারণে তা ভিন্নমাত্রিকতা পেয়েছে। তাঁর কবিতায় হাজারো চিত্রের আর চিত্রকল্পের ছড়াছড়ি। প্রকৃতির কাঁধে চড়ে সময়কে পকেটে পুরে তিনি একের পর এক কবিতার শরীর নির্মাণ করেছেন; কখনো গাছের ছায়ায়, কখনো রোদের মায়ায়, ভোরের আলোয় কিংবা রাতের আঁধারে। তাঁর প্রকৃতি প্রেমের পরিচয় তিনি এভাবে দিয়েছেন-

‘আমার ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো

গেলাসে গেলাসে পান করি,

এই ঘাসের শরীর ছানি-চোখে ঘশি,

ঘাসের পাখনায় আমার পালক,

ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোন এক নিবিড় ঘাস-মাতার

শরীরে সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।’

জীবনানন্দ দাশ ছিলেন প্রেমের কবি। তাঁর কবিতার সর্বত্রই প্রেমের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষ্যনীয়।  কবি নর-নারীর স্বর্গীয় ভালোবাসায় আবিষ্কার করেছেন মৃত্যুহীন অমরতা। ‘প্রেমহীন হাজার বছর বাঁচা’- কে কবি বীভৎস মৃত্যুর নামান্তর মনে করেন। অহর্নিশ নিরন্তর ভালোবেসেছেন তিনি। সারাক্ষণ প্রকৃতিকে। সতত মানুষকে। বিরহের মাঝেও তিনি ভাবী মিলনের আনন্দের অস্তিত্ব কল্পনা করতেন এবং টের পেতেন। ভালোবাসার উগ্রতার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন। যুদ্ধে জয়লাভ করাই শেষ কথা নয়, কোলকাতা কল্লোলিনী কিংবা তিল্লোত্তমা হলো কি হলো না, তাতে কবির কিছুই যায় আসে না। কবি বলেছেন-

‘এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা

সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।

কলকাতা এক দিন কল্লোলিনী তিল্লোত্তমা হবে;

তবুও তোমার কাছে আমার হ্নদয়।

বলা হয়ে থাকে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন জন্মলগ্ন থেকেই কাব্য প্রতিভার অধিকারী। তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক উজ্জ্বল কবি। জীবনানদ দাশের সারাজীবনের সাধনা ছিল সকলের থেকে নিজেকে একেবারে আলাদা করা। পরিমাণ বৃদ্ধির চেয়ে গুণগত মান বৃদ্ধিকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সকলের পছন্দের কবি তিনি হতে চান নি। তিনি চেয়েছেন মানসম্মত পাঠক তাঁকে জানুক, যাদের বোধে সাহিত্যটা ভালভাবে আসে। জীবনানন্দের ছিল নতুনত্ব সৃজন- কৌশলের নতুনত্ব। সমাজ চেতনা তাঁর কবিতাকে যুগের সাথে চলার এবং যুগকে নিয়ে বলার পথ বাতলে দিয়েছে। গ্রামকে বড্ড বেশী ভালোবাসতেন কবি। তাঁর পঞ্চান্ন বছরের জীবন কালের প্রায় বেয়াল্লিশ বছরই তিনি কাটিয়েছেন বরিশালে। বাকীটা সময় কাটিয়েছেন মূলত কলকাতা ও দিল্লিতে।

প্রবাহমান নদীর সতত ছুটে চলা একদিন হয়তো সাগরে গিয়ে শেষ হবে। কিন্তু তবুও তিনি শেষ হয়ে যাবেন না। তাঁর জলধারা সাগরের জলধারার সাথে মিশে মহাসাগরে পরিণত হয়েছে। পানিচক্রের অমোঘ বিধানে তিনি আবার আবির্ভূত হবেন নতুন কোন জলসিঁড়ি কিংবা ঝরনারুপে। তাঁর জলধারায় সর্বদায় অহর্নিশ নিরন্তর স্নাত হবে বাঙ্গালী কবিতা প্রেমিরা।

বাংলা সাহিত্যের এই নিঁখাদ বিশুদ্ধতম কবির আজ ১১৮ তম জন্মবার্ষিকী। জন্মদিনে কবির প্রতি রইলো নিরন্তর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। হাজার বছর ধরে তিনি থাকবেন এই বাংলার মাঠ, নদী, আকাশ আর বিদীর্ণ সবুজ প্রান্তর জুড়ে।

 


Like it? Share with your friends!

0

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলার নৈসর্গিক কবি

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles