বাচ্চার বাবা’র লাশ আসবে

একটুপর বয়স্ক একজন এসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো। তাঁর কাছ থেকে জানলাম, তিনি বাচ্চার দাদা। বাচ্চার বাবা'র লাশ আসবে। প্রবাসে মারা গেছে।


Bansuri M Yousuf

ক্যানোপীর বাইরের এলাকা। অনেকে অপেক্ষা করছেন, প্রিয়জন আসবে বিদেশ থেকে। মাঝবয়েসী ভদ্রমহিলাটি নিভৃতে কাঁদছেন। কেন কাঁদছেন, একাধিকবার প্রশ্ন করে উত্তর পাচ্ছি না। আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে সাত-আট বছরের একটি ছেলে।
– উনি তোমার মা?
– হ্যাঁ
– মা কাঁদছে কেন?
– জানি না
– বিদেশ থেকে কে আসবে?
– (চুপ)
– তোমার বাবা কোথায়?
– মা’র মোবাইলে
– বাবা আসবে?
– হ্যাঁ
একটুপর বয়স্ক একজন এসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো। তাঁর কাছ থেকে জানলাম, তিনি বাচ্চার দাদা। বাচ্চার বাবা’র লাশ আসবে। প্রবাসে মারা গেছে।
– বাচ্চাটাকে কেন নিয়ে আসলেন?
– রেখে আসতে চাইছি, পারি নাই।
– বাবার জন্য কান্নাকাটি করে?
– ছোট মানুষ বুঝে না। কাঁদে না। পেটে রেখে বিদেশ গেছিলো ওর বাপ। মোবাইলে বাপের ছবি দেখছে, কথা বলছে। বাপকে কখনও সামনাসামনি দেখে নাই। তাই দেখতে চলে আসছে।

আরেক দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই বাচ্চার কাছে বাবার সংজ্ঞা কি হবে?
‘বাবারা মোবাইলে কথা বলে, ছবি দেখা যায়। একসময় বাকসাভর্তি হয়ে সামনে আসে, নাকের দুই ছিদ্রে তুলা দেখা যায়।’
…………..
আনমনা হয়ে ফিরে আসছিলাম। কি যেন ভেবে আবার গেলাম।
– আপনারা এই ক্যানোপীতে অপেক্ষা করছেন কেন?
– শুনলাম এই পথ দিয়া সবাই বিদেশ থেকে আসে, তাই।

আগেরদিন ফোনে বিএমইটি থেকে তাদেরকে বলা হয়েছে, আজ লাশ আসবে। ওনারা চলে আসছেন, অপেক্ষা করছেন।

একজনকে গাইড হিসেবে দিয়ে তাদেরকে লাশ রিসিভের জন্য ৮ নম্বর হ্যাংগার গেইটে পাঠিয়ে দিলাম (যা টার্মিনাল ভবন থেকে ১০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত)।

প্রিয় পাঠক, ঘটনাটি বেশ কয়েকমাস আগের। আমরা সবাই জানি, বিদেশগামী মানুষ এয়ারপোর্টের কোন পথ দিয়ে প্রবেশ করে এবং বিদেশফেরত মানুষ কোন পথ দিয়ে বের হয়। কিন্তু কেউ জানিনা বিদেশফেরত বাকসাবন্ধী মানুষকে কোন পথ দিয়ে বের করে আনতে হয়, কিভাবে রিসিভ করতে হয়।

ও আচ্ছা, আপনাদের ধারণা, আমি এখন বয়ান দেবো, মাস্টরি করবো… কোথায় কিভাবে লাশ রিসিভ করতে হয়। ভুল। আমি এমন কিছু বলবো না, যেটা আপনাকে অপ্রয়োজনে মনে রাখতে হয়। আমি চাইলেও আপনি তা মনে রাখবেন কেন? আপনার প্রিয়জন কখনও প্রবাসে মারা যাবে, এমন অপ্রত্যাশিত চিন্তা আমার-আপনার কারও জন্য সুখকর নয়। অতএব ভুলে যান। কিন্তু দয়াকরে লিখাটা শেষ পর্যন্ত পড়বেন।

ষোলকোটি মানুষের মধ্যে মাত্র এককোটি মানুষ প্রবাসে থাকে। সুতরাং বাকি পনেরকোটি মানুষের জন্য তো বিষয়টি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এককোটি প্রবাসীর মধ্যে প্রতিদিন মাত্র দশবারো জনের লাশ দেশে আসে। বাকীদের কাছেও বিষয়টি অপ্রয়োজনীয়, লাশ হতে কে চায়? তবে সমাধান কি?

ডোন্ট মাইন্ড, একটা পরামর্শ দেই। যেইদিন বিদেশ যাবেন, হাতে একটু সময় নিয়ে আত্মীয়স্বজনসহ একটু আগে চলে আইসেন। আত্মীয়স্বজনকে আট নম্বর হ্যাংগার গেইটে অন্য স্বজনরা কিভাবে লাশ রিসিভ করে তার ডেমো দেখিয়ে দিয়েন। ব্যাস, আপনি মরে গেলেও কারও কাছে আপনার শোকার্ত পরিবার ধর্ণা দিতে হবে না। এটা সহজ সমাধান। আরেকটা বিকল্প সমাধান হতে পারতো….

আপনার মৃত্যুর খবরে যখন পরিবার দিশেহারা, জানেনা কখন কিভাবে কোথায় লাশ রিসিভ করবে, কি কি লাগবে, ঠিক তখনই আপনার প্রিয়জনের মোবাইলে কল যাবে…
– হ্যালো, প্রবাসী কল্যাণবোর্ডের এয়ারপোর্ট অফিস থেকে বলছি। কাল এই সময় মরদেহ আসবে। একটা এম্বুল্যান্স নিয়ে ৮ নম্বর হ্যাংগার গেইটের সামনে আমাদের বুথে চলে আসবেন। এটি আমাদের ফোন নম্বর। যাবতীয় ব্যবস্থা আমরাই করে দেবো। মরদেহ রিসিভের জন্য রিসিভারের পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং পরিবহন-দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা রিসিভের জন্য চেয়ারম্যান/কমিশনারের প্যাডে একটি ওয়ারিসান সনদ নিয়ে আসবেন দয়াকরে।

একবার চিন্তা করে দেখুন তো, ঠিক এই ধরণের একটা ফোন কল পেলে আপনার প্রিয়জনের মাথা থেকে কতবড় বোঝা নেমে যেতো। নিদেনপক্ষে তিনি লাশের টেনশন বাদ দিয়ে আপনার জন্য শান্তি মতে একটু কাঁদতে পারতো।

মজার বিষয় কি জানেন? কাগজে কলমে ঠিক এই বিকল্প ব্যবস্থাটাই চালু আছে।

এয়ারপোর্টে প্রবাসী কল্যাণের মোট ২৭/২৮ জনের মতো কর্মচারী শিফ্টিং ডিউটি করে। এর মধ্যে ২০/২১ জন বিএমইটি’র কর্মচারী এবং অবশিষ্ট ৭/৮ জন প্রবাসী কল্যাণবোর্ডের। বিএমইটি’র কর্মচারীদের দায়িত্ব হলো, ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স কার্ড চেক এবং ডিপোর্টী প্যাসেঞ্জারদের হিসেব সংগ্রহ। প্রবাসী কল্যাণবোর্ডের কাজ হলো, প্রবাসীদের মরদেহের যাবতীয় বিষয়টি কোর্ডিনেট করা। এম্বেসী ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লাশ ও রিসিভারের যাবতীয় তথ্য কল্যাণবোর্ডের কর্মচারীদের কম্পিউটারে আগেই চলে আসে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, লাশ হস্তান্তরের স্থানে (৮ নং হ্যাংগার গেইট) কল্যাণবোর্ডের কোন বুথ বা অফিস নেই। পরিবারকে ফোন করে বলারও কোন সিস্টেম নেই। লাশ হস্তান্তরে তাদের কোনরূপ উপস্থিতি কিংবা সহায়তা নেই।

তাদের কার্যক্রম এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ভবনের ডিপার্চার হলে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে। এখান থেকে তারা কেবল লাশ-দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার সহায়তার চেক ইস্যু করে থাকেন!

কোন ব্যাক্তি দশঘাটের পানি খেয়ে নিজ উদ্যোগে হ্যাংগার গেইট থেকে লাশ নেয়ার পর যদি কোনভাবে চেকের বিষয়ে পূর্ব থেকে জেনে থাকেন, তখনই কেবল তিনি আরও চৌদ্দঘাটের সিকিউরিটি ডিঙিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে এসে চেক ক্লেইম করতে পারেন। ক্লেইম করা হলে তাকে একটা ওয়ারিসান সনদের ফরমেট ধরিয়ে দেয়া হয়, যার আদলে সনদ জোগাড় করে পরে আবার এসে চেক নিতে হয়। পরে কেউ আসেন, কেউ আসেন না। আর যিনি চেকের বিষয়ে জানেন না, তিনিতো আসার প্রশ্নই আসে না।

এবার আসি মূল কথায়। দাফন-খরচের যেই ৩৫ হাজার টাকাকে আমরা সহায়তা ভাবছি, আসলেই কি তা সহায়তা? পরবর্তীতে যে দুই-তিন লাখ টাকার মত অনুদানের কথা জানি, আসলেই কি তা অনুদান? এগুলো সহায়তা কিংবা অনুদান কোনটিই নয়। আপনাদেরই টাকা। প্রিপেইড সার্ভিস।

ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স কার্ড করার সময় প্রত্যেক প্রবাসী ২৫০ টাকা সার্ভিস চার্জের পাশাপাশি কল্যাণবোর্ডে ৩৫০০ টাকা চাঁদা দেন। এই চাঁদার প্রধান খরচের খাত হলো এই অনুদান/সহায়তা! প্রত্যেক প্রবাসী চাঁদা দেয়, হাজারে একজন মারা যায়, হিসেব খুব সহজ। সবার চাঁদায় এই তহবিল গঠিত হয়, যে কয়জন মারা যান, কেবল তারাই এই অনুদান পান। আক্ষরিক অর্থে লাশ সংক্রান্ত যাবতীয় সার্ভিসই প্রবাসীদের প্রিপেইড সার্ভিস।

শেষ করি। প্রথমোক্ত ঘটনাটি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে আমি বহু জায়গায় ধর্ণা দিয়েছি এই সার্ভিসটাকে কাগজ থেকে বাস্তবে আনার জন্য। পারি নাই। তাই বাধ্য হয়ে সহজ পরামর্শটি দিলাম, এগেইন ডোন্ট মাইন্ড।

ইয়ে, পারি নাই, কথাটি ফাইনাল না। চিন্তা করতেছি, কল্যাণবোর্ডের লোকজনের এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ভবনের ভেতরে কি কাজ? লাশ তো আসে হ্যাংগার গেইটে। বিনা-প্রয়োজনে এয়ারপোর্টের মূল ভবনে তাদের প্রবেশ কেন অবৈধ নয়?


Like it? Share with your friends!

0

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাচ্চার বাবা’র লাশ আসবে

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles