বাবরি মসজিদ

১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে পা রাখেন প্রথম মুঘল সম্রাট জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর। আরো কিছু অঞ্চল জয় করে ১৫২৭ সালে মধ্য-ভারত থেকে উ


ভারতের উত্তর প্রদেশের , ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট হিলের উপর অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ।
মসজিদটি ১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারতের প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে নির্মিত হয় এবং তাঁর নাম অনুসারে নামাঙ্কিত হয়।
বাবরি মসজিদ সরাসরি সম্রাট বাবর নির্মাণ করেননি। বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন বাবরের সাথে আগত মীর বাকী নামে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে,
১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে পা রাখেন প্রথম মুঘল সম্রাট জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর। আরো কিছু অঞ্চল জয় করে ১৫২৭ সালে মধ্য-ভারত থেকে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা অতিক্রমের সময় বাবর চিতোরগড়ের রানা সংগ্রাম সিংকে সিক্রিতে পরাস্ত করেন। অধিকৃত অঞ্চলে সেনাপতি মীর বাকিকে প্রশাসকের দায়িত্বে রেখে যান বাবর। তার মীর বাকীর প্রচেষ্টায় নির্মিত হয় বাবরি মসজিদ।
বাবরি মসজিদের মধ্যে প্রাপ্ত প্রস্তরফলক থেকে জানা যায়, মীর বাকী মসজিদটি স্খাপন করেন ৯৩৫ হিজরিতে।

মসজিদের নির্মাণকৌশলঃ
দিল্লির সুলতানি এবং তার উত্তরাধিকারী মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকরা শিল্প এবং স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁদের নির্মিত অনেক সমাধি , মসজিদ ও মাদ্রাসা সূক্ষ নির্মাণকৌশলের নিদর্শন বহন করে। মুঘলদের স্থাপত্য তুঘলক রাজবংশের স্থাপত্যের প্রভাব বহন করে যার একটি স্বতন্ত্র গঠনশৈলী আছে। ভারতের সর্বত্র, মসজিদসমূহের ভিন্ন ভিন্ন গঠনশৈলী আছে যা বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছিল। এই নির্মাণগুলির মধ্যে আদিবাসী শিল্প ঐতিহ্য এবং স্থানীয় কারিগরদের মার্জিত শৈলী ও দক্ষতা উভয়ই প্রকাশ পায়। মসজিদের নির্মাণে আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক জলবায়ু, ভূখণ্ড, উপকরণ ইত্যাদি প্রভাব ফেলতো যার ফলে
বঙ্গ , কাশ্মীর ও গুজরাটের মসজিদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। মসজিদগুলি শুধুমাত্র স্থানীয় মন্দির বা গার্হস্থ্য গঠনশৈলীর মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। বাবরি মসজিদ জানপুরের সুলতানি স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে।
বাবরি মসজিদ তার সংরক্ষিত স্থাপত্য ও স্বতন্ত্র গঠনশৈলীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মসজিদটি সম্রাট আকবর দ্বারা গৃহীত ইন্দো-ইসলামী গঠনশৈলীর প্রতীক ছিল।
বাবরি মসজিদের অভ্যন্তরীণ শব্দ-নিয়ন্ত্রণ এবং শীতলীকরণের ব্যবস্থাও ছিল।
আধুনিক স্থপতিদের মতে বাবরি মসজিদের চিত্তাকর্ষক স্থাপত্যবিদ্যার কারণ হল মসজিদটির
মিহরাব (মসজিদের একদিকে একটি অর্ধবৃত্তাকার দেয়াল যেটি
ক্বিবলা নির্দেশ করে) ও পার্শ্ববর্তী দেয়ালগুলিতে বিভিন্ন খাঁজ যা অনুনাদক হিসাবে কাজ করত। এই নকশা মেহরাবে অবস্থিত ইমামের কথা সবাইকে শুনতে সাহায্য করত। এছাড়াও বাবরি মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বেলেপাথর অনুনাদের কাজ করে যা মসজিদটির শব্দ-নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করত।

বাবরি মসজিদ ও রামমন্দির বিতর্কঃ-
উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিশ্বাস অনুযায়ি,
‘অযোধ্যাই ছিল রাজা রাম চন্দ্রের রাজধানী। রাম কেবল রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিষ্ণুর অবতার। রামের মৃত্যুর পর অযোধ্যায় স্খাপিত হয় রাম মন্দির।
মীর বাকী এই রাম মন্দির ভেঙে সেখানে নির্মাণ করেন বাবরের নামে বাবরি মসজিদ।’
রামায়ণ ভারতীয় সাহিত্যের বিখ্যাত একটি কাব্যগ্রন্থ মাত্র। এই কাব্যগ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ি, অযোধ্যা রামের জন্মভূমি।
কিন্তু রামায়ণের বর্ণনা অনুসরণ করে এ পর্যন্ত অযোধ্যায় কোনো প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়নি।
যেমন আবিষ্কৃত হতে পেরেছে গ্রিক কবি হোমারের ইলিয়াড কাব্যগ্রন্থের বর্ণনা অনুসরণ করে ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ। ইলিয়াডের রচনাকাল ধরা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০ অব্দের কাছাকাছি।
ইলিয়াডের ঘটনার সাথে রামায়ণের ঘটনার কিছু কিছু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। এটা প্রাচীন গ্রিকদের প্রভাবের ফল কি না বলা যায় না। রামায়ণে পাওয়া যায় শ্রীলঙ্কার বর্ণনা।
শ্রীলঙ্কার রাজা রাবণ রামের স্ত্রী সীতাকে চুরি করে নিয়ে যান। ফলে বাধে রাম-রাবণের যুদ্ধ। রামায়ণে রাবণের রাজধানী #কনকলঙ্কার বিশেষ প্রশংসাপূর্ণ বর্ণনা আছে।
কিন্তু শ্রীলঙ্কাতেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়নি। হোমারের বর্ণনা অনুসরণ করে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হতে পেরেছে তুরস্কে।
কিন্তু রামায়ণের বর্ণনা অনুসরণ করে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এখনো সম্ভব হয়নি।
তাই বলা যায় না, যেখানে বাবরি মসজিদ অবস্খিত, এক সময় সেখানে ছিল রাম মন্দির। হতে পারে রামায়ণের কাহিনীর উদ্ভব ভারতে হয়নি, এই কাহিনীর কাঠামো এসেছে বাইরে থেকে। তবে বিষয়টি গবেষক মহলে হয়ে আছে বিতর্কমূলক।

অসন্তোর সুত্রপাত ও দখলের প্রচেষ্টাঃ-
বাবরি মসজিদ নিয়ে উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হযয় অসন্তোষ, দাঙ্গা ও মামলা। জমি নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে #প্রথম অসন্তোষ দেখা দেয় ১৮৫৩ সালে।
হিন্দুদের একটি গ্রুপ মসজিদটিকে রামমন্দিরের ওপর নির্মিত বলে দাবি করে।
দু’বছর শুধু এ নিয়েই দেন-দরবার চলতে থাকে। ১৮৫৭ সালে এ নিয়ে দেখা দেয় দাঙ্গা।
১৯০৫ সালের ফয়জাবাদ জেলা গেজেটে বলা হয়, ‘১৮৫৫ সাল থেকে হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই স্থাপনাটি (মসজিদ) যার যার ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করছিল।
কিন্তু ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর প্রশাসন মসজিদের সামনে একটি বেষ্টনী তৈরি করে এবং হিন্দুদের মসজিদের ভেতরের আঙিনায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। হিন্দুরা এতে মসজিদের বাইরের আঙিনায় একটি বেদী স্থাপন করে পূজা করে।’ অর্থাৎ মসজিদের ভেতরের অংশ ব্যবহার করছিল মুসলিমরা আর বাইরের অংশ হিন্দুরা। এরপর হিন্দুরা ১৮৮৩ সালে বাইরের অংশের বেদীতে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ১৮৮৫ সালে প্রশাসন তা স্থগিত করে। পরের বছর দু’দফা মন্দির নির্মাণের অনুমতি চাওয়া হলেও জেলা আদালত তা খারিজ করে দেয়। এতে হিন্দুদের আইনগত লড়াই প্রায় ফুরিয়ে যায়। ১৯৩৪ সালে আরেক দফা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মসজিদটির চারপাশের দেয়াল ও একটি গম্বুজ ভেঙে ফেলা হয়। বৃটিশরা তা নির্মাণ করে। পরে মসজিদ ও তৎসংলগ্ন কবরস্থানকে ওয়াকফ হিসেবে রেজিস্ট্রি করা হয়। ওই সময় মুসলিমদের ওপর চালানো নির্যাতন ১৯৪৯ সালে লিপিবদ্ধ করেন ওয়াকফ পরিদর্শক মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি জানান, ‘মসজিদে যাতায়াতকারী মুসল্লিদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা হতো। ছুড়ে মারা হতো জুতা ও পাথর। মুসলিমরা প্রাণভয়ে টু শব্দটিও করত না। এরপর ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর গভীর রাতে একদল হিন্দু সঙ্গোপনে রাম ও সীতার মূর্তি মসজিদের ভেতর প্রতিষ্ঠা করে। বলা হয়, মসজিদ প্রহরারত পুলিশ তখন ঘুমিয়ে ছিল। সকালে ৫-৬ হাজার হিন্দু বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে মসজিদে ঢুকতে গেলে পুলিশ তাদের কোনোমতে ঠেকাতে সক্ষম হয়। স্থায়ীভাবে মসজিদের গেট বন্ধ করে দেয়া হয়।’

বাবরি মসজিদ সম্পর্কে এলাহাবাদ হাইকোর্টের হাস্যকর রায়ঃ-
এহলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয়ার সময় বলেছেন, হিন্দুরা যেহেতু বিশ্বাস করে, রামের জন্মভুমি অযোধ্যা। তাই তাদের সেই বিশ্বাসকে মর্যাদা দিতে হবে। আর ছেড়ে দিতে হবে বাবরি মসজিদের ওয়াক্ফর তিন ভাগের দুই ভাগ জায়গা।’ বিষয়টি বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে অনেকের মনে। কারণ এহলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় প্রদান করেছেন হিন্দু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে, আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নয়।

বাবরি মসজিদ ও হিন্দু মুসলিম চুড়ান্ত সংঘাতঃ-
১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা এল কে আদভানির নেতৃত্বে রাজনৈতিক সমাবেশের ডাকদেয়, এবং এই মর্মে সমাবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত হয় যে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে যা ১৫০,০০০ জন সম্মিলিত এক পর্যায়ে দাঙ্গার রূপ নেয় এবং মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ভূমিসাৎ করা হয়।
ফলস্বরূপ ওই একই সালে ভারতের প্রধান শহরগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সেই মুহূর্তঃ-
রামকথা পার্ক তৈরী ও পর্যটন উন্নয়নের নাম করে বেশ কিছু মন্দির আর ধর্মশালার জমি অধিগ্রহণ করে জমি সমান করে দিয়েছিল কল্যাণ সিংয়ের সরকার।
ফৈজাবাদ থেকে সরাসরি অযোধ্যার বিতর্কিত এলাকা অবধি চওড়া সড়ক তৈরি করা হয়েছিল।
সারা দেশ থেকে আসা কর সেবকদের থাকার জন্য বিতর্কিত এলাকার গায়ে লাগা জায়গায় লাইন দিয়ে তাঁবু খাটানো হয়েছিল।
তাঁবু খাটানোর জন্য কোদাল, মোটা রশি প্রচুর সংখ্যায় সেখানে জড়ো করা হয়েছিল। সেগুলো পরে মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে ফেলার কাজে লাগানো হয়েছিল।
মোটের ওপরে বিতর্কিত পরিসরের চারদিকটা কর সেবকদেরই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এরা ৪-৫ দিন আগে থেকেই আশপাশের কিছু মাজারের ওপরে হামলা চালিয়ে আর মুসলমানদের কয়েকটা ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি গরম করে তুলেছিল আর নিজেদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমার পরিচয়ও দিতে শুরু করেছিল।
এসব সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত পরিদর্শক – জেলা জজ মি. তেজ শঙ্কর বারবার বলছিলেন যে শান্তিপূর্ণভাবে নিয়মরক্ষার কর-সেবা করানোর সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একদিন আগে,
৫ ডিসেম্বর দুপুরবেলা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মার্গ দর্শক মন্ডল আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নিল যে শুধুমাত্র নিয়মরক্ষার খাতিরেই কর-সেবা করা হবে বিতর্কিত এলাকায়।
তারা ঠিক করল যে কর সেবকরা সরযূ নদী থেকে জল আর মুঠি ভর মাটি নিয়ে আসবেন আর মসজিদের কাছেই মন্দিরের শিলান্যাস হয়েছে যেখানে, সেখানে ওই মাটি আর জল অর্পণ করে চলে যাবেন।
এই সিদ্ধান্তের কথা ছড়িয়ে পড়তেই কর-সেবকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব করসেবকপুরম-এ [অযোধ্যায় কর-সেবকদের থাকা-খাওয়ার জন্য সাময়িক ব্যবস্থা ছিল যে চত্ত্বরে] পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই উত্তেজিত কর-সেবকরা তাকে ঘিরে ধরে অকথা – কুকথা বলছিল।
তারা বলছিল যে,
নেতারা যাই বলে থাকুন না কেন তারা আসল কর-সেবা করে তবেই ফিরবেন, অর্থাৎ মসজিদ ধ্বংস করবেনই তারা।
সন্ধ্যে থেকেই কর-সেবকরা কয়েকজন টিভি সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফারের সঙ্গে দুর্বব্যহার করছিল, মারধর করছিল।
ওদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির বর্ষীয়ান নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী লক্ষ্ণৌতে এক জনসভায় ভাষণ দিয়ে কর-সেবকদের আরও উৎসাহিত করে তোলেন।
মি. বাজপেয়ী সন্ধ্যের ট্রেনে দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। আদভানী এবং মুরলী মনোহর যোশী – এই দুই নেতা মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে রাতেই অযোধ্যা পৌঁছে যান।
সেটা ছিল ৫ ডিসেম্বরের রাত।
পরের দিন ভোর থেকেই গোটা অযোধ্যা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠছিল, অন্যদিকে পাশের শহর ফৈজাবাদের সেনা ছাউনিতে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও তৈরি হচ্ছিলেন কারণ যে কোনও মুহূর্তে তাঁদের ডাক পড়তে পারে অযোধ্যার দখল নেওয়ার জন্য।
সেনা আর বিমানবাহিনীও নজরদারী চালাচ্ছিল।
রাজ্য সরকার তখনও তার আগের অবস্থানেই অনড় ছিল – আধা সামরিক বাহিনী বা সেনাবাহিনী কিছুই তারা নামাতে রাজী হয় নি। তাদের স্পষ্ট কথা – কর-সেবকদের ওপরে কোনও রকম বল প্রয়োগ চলবে না।
৬ তারিখ সকাল থেকেই আমরা সাংবাদিকরা মানস ভবন ধর্মশালার ছাদে প্রেস গ্যালারিতে জায়গা দখল করেছিলাম। মসজিদের ঠিক মুখোমুখি ছিল আমাদের জায়গাটা।
তার ডানদিকে, ‘জন্মস্থান মন্দির’-এর ওপরে কমিশনার, ডিআইজি সহ প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বসেছিলেন।
আর বাঁদিকে রামকথা কুঞ্জ-তে একটা সভাস্থল তৈরি হয়েছিল যেখানে অশোক সিংঘল, আদভাণী, মুরলী মনোহর যোশী, উমা ভারতীদের মতো শীর্ষ নেতারা জড়ো হয়েছিলেন।
মসজিদ আর আমাদের প্রেস গ্যালারী মানস ভবনের মাঝামাঝি যেখানে শিলান্যাস স্থল তৈরি হয়েছিল, সেখানেই ব্যবস্থা হয়েছিল যজ্ঞের। মহন্ত রামচন্দ্র পরমহংস সহ বহু সাধু সন্ন্যাসী সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
ঠিক এই জায়গাটাতেই বেলা এগারোটা থেকে নিয়মরক্ষার কর-সেবা শুরু হওয়ার কথা ছিল।
চারদিকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা দেখভাল করছিল মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা আর এস এস সদস্যরা। তাদের পিছনে মোটা দড়ি লাগিয়ে দাঁড়িয়েছিল পুলিশ বাহিনী – যাতে শুধুমাত্র বিশিষ্ট ব্যক্তিরাই যজ্ঞস্থলে পৌঁছতে পারেন।
ঘড়ির কাঁটা যখন সাড়ে দশটা ছুঁয়েছে, তখন ড. যোশী [মুরলী মনোহর যোশী] এবং মি. আদভাণী [লালকৃষ্ণ আদবাণী] যজ্ঞস্থলের দিকে এগিয়েছিলেন। তাঁদের পেছন পেছন বহু কর-সেবকও ঢুকে পড়ছিল – সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম।
পুলিশ চেষ্টা করেছিল তাদের আটকাতে, কিন্তু পারে নি।
তখনই ওই সাধারণ কর-সেবকদের ওপরে লাঠি চালাতে শুরু করে মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাধা আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকরা। খুব দ্রুত এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় গোটা চত্ত্বরে।
মুহূর্তের মধ্যেই শতশত কর-সেবক মসজিদের দিকে দৌড়তে শুরু করে। মসজিদের নিরাপত্তার জন্য চারদিকে লোহার বেড়া লাগানো ছিল।
পিছনের দিক থেকে একটা দল গাছের ওপর দিয়ে দড়ি ছুঁড়ে দিয়েছিল। সেই দড়ি বেয়েই কর-সেবকরা মসজিদে ঢোকার চেষ্টা করছিল।
ভিআইপি এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল যে পুলিশ কর্মীরা, তারা কর-সেবকদের আটকাতে চেষ্টা করেছিল কিছুক্ষণ।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই একজন একজন করে কর-সেবক দড়ি বেয়ে মসজিদের গম্বুজে উঠে পড়ছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম স্পষ্টই।
মসজিদের গম্বুজের ওপরে কয়েকজন কর-সেবক পৌঁছিয়ে গেছেন, এটা দেখেই চারদিকে প্রচণ্ড আওয়াজ উঠতে লাগল, ‘এক ধাক্কা অউর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো’ [আরও একটা ধাক্কা দাও, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দাও]।
মাইকে অশোক সিংঘল [বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রধান] কর-সেবকদের বার বার অনুরোধ করছিলেন গম্বুজ থেকে নীচে নেমে আসার জন্য। কিন্তু তার সেই কথায় কেউ কানই দিচ্ছিল না।
যার হাতে যা ছিল – কোদাল, শাবল, গাঁইতি – তাই দিয়েই গম্বুজের ওপরে আঘাত করা হচ্ছিল। কয়েকজনকে তো দেখছিলাম চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি মসজিদের গায়ে হাত দিয়েই গর্ত করছে!
এরই মধ্যে মসজিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সশস্ত্র পুলিশ কর্মীরা কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে বাইরে চলে এলো। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন – কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাঁরা।
কর-সেবকদের একটা অংশ আবার আশেপাশের সব টেলিফোনের তার কেটে দিচ্ছিল। অন্য একটা দল মানস ভবনের ছাদে আমাদের প্রেস গ্যালারীতে উঠে এলো। চিত্র সাংবাদিকদের তারা স্পষ্টই ছবি তুলতে বারণ করে দিল। আমি আমার ক্যামেরাটা এক নারী সাংবাদিকের ব্যাগে লুকিয়ে রাখলাম।
তবে বেশ কয়েকজন চিত্র সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে তাদের মারধরও করা হয়েছিল নীচে।
মি. আদভাণীর আশঙ্কা ছিল ফৈজাবাদ থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী বা এমন কি সেনাবাহিনীকেও তলব করা হতে পারে। তাই তিনি জনতাকে আহ্বান করলেন সবাই যাতে ফৈজাবাদ-অযোধ্যা প্রধান সড়কে অবরোধ তৈরি করে।
মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের কাছে যখন সব খবর পৌঁছল, তিনি তখনই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু মি. আদভাণী বাধ সাধেন। কল্যাণ সিংকে তিনি বুঝিয়েছিলেন যে মসজিদ ভেঙ্গে পড়ার আগেই পদত্যাগ করলে সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়ে যাবে, গোটা ব্যবস্থাই নিয়ন্ত্রণ করবে দিল্লির কংগ্রেস সরকার।
অবশেষে বিকেল পাঁচটা নাগাদ কল্যাণ সিং ইস্তফা জমা দিয়েছিলেন – ততক্ষণে বাবরি মসজিদের তিনটি গম্বুজই ভেঙ্গে পড়েছে।
রাষ্ট্রপতি শাসন তো জারি হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে কী করা উচিত!
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বা সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়া হতে পারে, এই ভয়ে অযোধ্যা থেকে তখন কর-সেবকরা দ্রুত চলে যাচ্ছেন।
বহু কর-সেবক স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে বাবরি মসজিদের একটা ইটের টুকরো সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার দায়ে লক্ষ লক্ষ অজ্ঞাত কর-সেবকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিল পুলিশ।
তবে বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আট জন শীর্ষ নেতা নেত্রীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেছিল পুলিশ।
ওদিকে প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও সারাদিন নিশ্চুপ ছিলেন।
সন্ধেবেলা জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া বিশেষ ভাষণে তিনি অবশ্য গোটা ঘটনার চূড়ান্ত নিন্দা করেই থেমে থাকেন নি, মসজিদ পুনর্নির্মাণের কথাও বলেছিলেন।
অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বলপ্রয়োগ না করে যাতে অযোধ্যা থেকে কর-সেবকদের সরিয়ে দেওয়া যায়, তার জন্য দিল্লির নির্দেশে প্রচুর বিশেষ ট্রেন ও বাস চালানো হয়েছিল।
কর-সেবকদের একটা গোষ্ঠী ততক্ষণে মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপরেই অস্থায়ী রামমন্দির তৈরি করছিল। মূর্তিও বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
পরের দিন, সাত ডিসেম্বর, আমরা সবাই সারাদিন অপেক্ষা করেছিলাম যে কখন পুলিশ প্রশাসন মসজিদের ধ্বংসস্তূপের দখল নেবে, তার জন্য।
ভোর চারটে নাগাদ কিছু হতে পারে এরকম খবর পেয়ে দৌড়লাম বিতর্কিত এলাকায়।
দেখলাম হাতে গোণা যে কয়েকজন কর-সেবক সেখানে ছিলেন, তাদের সরিয়ে দিয়ে অস্থায়ী মন্দিরের দখল নিল প্রশাসন।
তবে পুলিশ আর কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা দেখলাম ওই অস্থায়ী মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রামলালার মূর্তি দর্শন করে খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে মাথা নুইয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছে।
সেই সব ছবিও তুলেছিলেন তিনি।
মসজিদ ধ্বংস হওয়া আর বিতর্কিত এলাকার আবারও দখল নেওয়া – দুটো খবরই তিনি প্রথম পাঠিয়েছেন বিবিসি-র কাছে।
সেটার জন্য যেমন গর্ব হয় এখনও, তেমনই সিকি শতাব্দী পরে যখন গোটা ঘটনাটা ফিরে দেখি, তখন কেবলই মনে হয় সেদিন আসলে আমার চোখের সামনে শুধুই একটা মসজিদ ভেঙ্গে পড়ে নি।
ভারতের সংবিধানের তিনটি স্তম্ভ – আইনসভা, প্রশাসন আর বিচারব্যবস্থা – তিনটির মর্যাদাও সেদিন ভেঙ্গে গিয়েছিল।
আইনের শাসনের বুনিয়াদী ধারণাটাই ভেঙ্গে পড়েছিল ৬ই ডিসেম্বর।
আঘাত এসেছিল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে পরিচিত গণমাধ্যমের ওপরেও।
আর যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং-সেবক সংঘ বা আর এস এস কঠোর নিয়ম, কড়া অনুশাসন পালনের জন্য পরিচিত, সেই ‘সংঘীয় অনুশাসন’ও চোখের সামনেই ভেঙ্গে গিয়েছিল।
সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়ার পরেও গত ২৫ বছরে বাবরি মসজিদ- রাম-জন্মভূমি নিয়ে বিতর্ক কিন্তু যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে।
সুত্রঃ
রামদত্ত ত্রিপাঠী,
বিবিসি সংবাদদাতা।

লিবারহান তদন্ত কমিশনঃ-
মসজিদটি ধ্বংসের ১০ দিন পর ১৬ ডিসেম্বর গঠিত লিবারহান কমিশন ১৬ বছর পর ২০০৯ সালের ৩০ জুন তার রিপোর্ট দেয়।
গণমাধ্যমে নভেম্বরে ওই রিপোর্টের বিষয়বস্তু ফাঁস হয়ে যায়। এতে দেখা যায়, ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন ভারতীয় সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা ঘনিষ্ঠভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত। মসজিদ ভাঙার দিন বিজেপি নেতা এল কে আদভানি ও অন্যরা বিনয় কাতিয়ার বাসায় মিলিত হন। সেখান থেকে তারা যান মসজিদ প্রাঙ্গণে স্থাপিত পূজা বেদীতে। আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী ও কাতিয়া ২০ মিনিট ধরে ধ্বংসের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখেন। পরে যোশী ও আদভানি ২০০ মিটার দূরে রাম কথাকুঞ্জে অবস্থান নেন। ওই কুঞ্জে একটি উঁচু বেদীও তৈরি করা হয় তাদের জন্য। করসেবকরা দুপুরে মসজিদ ভাঙতে গেলে কেউই তাদের বাধা দেয়নি। এ সময় আদভানির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ অফিসার অঞ্জু গুপ্তা লিবারহান কমিশনকে জানান, আদভানি ও যোশীর বক্তব্য ছিল উত্তেজনাকর। রিপোর্টে বলা হয়, ‘রাম কথাকুঞ্জে ওই ঘটনার হোতারা অবস্থান করছিলেন। তারা চাইলে খুব সহজেই করসেবকদের নিবৃত্ত করতে পারতেন।’ একইভাবে উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংও নানাভাবে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করেন। বিজেপি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ীকেও দায়ী করা হয় ওই রিপোর্টে।

পরিশেষে,
এটাই বলতে হয় যে,
মহৎ প্রাণ বাবরের নামানুসারে অযোদ্ধা তৈরী করা হয়েছিল বাবরি মসজিদ । সম্রাট বাবর নিজে ধার্মিক ছিলেন এবং সেই সাথে মহৎ প্রাণও ছিলেন, তার শাষণাকালে সকল ধর্মের লোক তার কাছে প্রজা হিসেবে সমান অধিকার পেত ।

তিনি এমন এক বাদশা ছিলেন, যিনি প্রবল ক্ষমতাধর বাদশা হয়েও পাগলা হাতির কবল থেকে মেথরের ছেলেকে উদ্ধার করেন, যদিও এতে তার জীবনের ঝুকি ছিল….!!!

কিন্তু,
সেই মহৎপ্রাণ বাবরের নামে তিলে তিলে গড়ে তোলা অযোদ্ধার বাবরি মসজিদটাকে উগ্রপন্থী হিন্দুরা ভেঙ্গে দিয়েছে….!!!

বাদশা বাবর যদি চাইতেন, তাহলে পুরো ভারতকে তার করায়ত্ব করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি,
কেননা তিনি ছিলেন খলিফা উমরে উত্তরসূরি।
তিনি কোন জোড় জবরদস্তি বরদাস্ত করেন নি,
তাইতো তার শাষনামলে সকল ধর্মের লোক ছিল সমানভাবে নিরাপদ।

কিন্তু,
আজ তারপরও বাদশা বাবরের নামে গড়া অযোদ্ধার মাটি আজ ঢুকড়ে ঢুকড়ে কাঁদে………!!!


What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাবরি মসজিদ

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles