বিপ্লব এবং বিশ্বাসঘাতকতা


কামরুল নাজিম : 

ডিম পাড়ে হাসে, খায় বাগডাসে। এটি বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে এই প্রবাদটি কিভাবে যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যায়।

১.
২রা নভেম্বর ভোররাত। ঘড়ির কাটা তখন চারটা ছুইঁ ছুঁই করছে। কর্ণেল তাহেরের নারায়নগঞ্জের বাড়ির টেলিফোনটি বেজে উঠে হঠাৎ। ঘুম জড়ানো গলায় টেলিফোনটি ধরেন কর্ণেল তাহেরের স্ত্রী লুৎফা তাহের। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে মেজর জিয়ার কণ্ঠস্বর। আমি জিয়া বলছি, তাহেরকে দেন তাড়াতাড়ি।

তাহের হ্যালো বলতেই নিচুস্বরে জিয়া বলেন- ‘তাহের লিসেন কেয়ারফুলি, আই এম ইন ডেঞ্জার, সেভ মাই লাইফ।’ লাইনটি কেটে যায়।
তাহের বুঝে যান যে আরো একটি ক্যু ঘটে গেছে। এমন একটা সম্ভবনার কথা সৈনিক সংস্থার লোকেরা জানিয়েছিল তাকে।

এবার আমরা আরো একটু পিছনে ফিরে যায়।
২ নভেম্বর ১৯৭৫। কনকনে শীতের রাত। মেজর ইকবালের নেতৃত্বে ১ বেঙ্গলের একটি কোম্পানী পাহাড়া দিচ্ছে বঙ্গভবন। ভেতরে অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং করছেন বঙ্গবন্ধুর হত্যার কুশীলব খন্দকার মোশতাক, জেনারেল খলিল, মেজর রশিদ, মেজর ফারুকরা। সেনাবাহিনীর ভেতরের অস্থিরতা নিয়েই কথা বলছিলেন তারা। সম্ভাব্য যেসব অফিসার সমস্যা তৈরি করতে পারেন তাদের কাউকে চাকরী থেকে অব্যাহতি, অন্যান্যদের বিভিন্ন জায়গায় বদলির কথাবার্তা হচ্ছিল। বঙ্গভবনের চারপাশে ফুলের বাগান। কিন্তু ফুল বাগান শোভিত নিরীহ ঐ ভবনটি তখন মিলিটারী ক্যান্টনমেন্টের মত দেখাচ্ছিল। মাঝরাত ফেরিয়ে গেলে বঙ্গভবন পাহাড়ারত মেজর ইকবালের কোম্পানীটি হঠাৎ তাদের কামান, মেশিনগানসহ অন্ধকারে, অত্যন্ত চুপিসারে বঙ্গভবন ছেড়ে রওনা দেয় ক্যান্টনমেন্টের দিকে। ভেতরে মিটিংরত মোশতাক এবং তার সঙ্গীরা তখনো তা জানেন না।

মেজর ইকবালের নেতৃত্বে বঙ্গভবনের নিরাপত্তা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পাল্টা অভ্যুত্থান। পাশাপাশি তরুণ ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহর নেতৃত্বে একটি দল যায় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করতে। রাত একটায় ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ তার প্লাটুন নিয়ে ঘিরে ফেলেন জিয়ার বাড়ি। ঘটনার আকস্মিকতায় জিয়ার বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা আত্নসমর্পণ করেন। জিয়া বেরিয়ে আসেন তার ড্রয়িং রুমে, রাতের পায়জামা, পাঞ্জাবী পরা। হাফিজুল্লাহ বলেন, ‘স্যার আপনি চিপ অব জেনারেল স্টাফ খালেদ মোশাররফের নির্দেশে বন্দি।
জিয়া কোন উত্তেজনা দেখান না। কোন উচ্চবাচ্য করেন না। শান্ত কণ্ঠে বলেন, অল রাইট।

হাফিজুল্লাহর নির্দেশে তার দলের সিপাইরা ড্রইংরুমের টেলিফোনের লাইনটি কেটে দেয়। বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। হাফিজুল্লাহ তাকেও বলেন, ‘ম্যাডাম আপনারা হাউস এরেস্ট। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ বের হতে পারবেন না ঘর থেকে’।

জিয়া বসে থাকেন ড্রইংরুমে। ড্রইংরুমের টেলিফোন লাইনটি বিচ্ছিন্ন করলেও হাফিজুল্লাহ ভুলে যান বেডরুমেও একটি টেলিফোন রয়েছে। তরুণ ক্যাপ্টেন জানেন না, ঐ ভুলে যাওয়া টেলিফোনের তার দিয়েই ঘটে যাবে ইতিহাসের পটপরিবর্তন।

ব্যাপারটি কৌতুহলোদ্দীপক যে জিয়া ঐ সংকটাপন্ন অবস্থায় তার ত্রীসীমানায় চেনা জানা অসংখ্য টেলিফোন নম্বরের মাঝ থেকে রাত চারটার সময় ফোন করলেন নারায়নগঞ্জে তাহেরের বেসামরিক নম্বরে। এখানে পাটিগণিতটি মোটেও জটিল কিছু নয়। জিয়া এই বন্দি দশা থেকে মুক্ত হতে চান। কে এখন এগিয়ে আসবে তাকে সাহায্য করতে। মেজর ফারুক, রশীদ, মোশতাক, ওসমানী? তারা সবাই ঐ মুহূর্তে অত্যান্ত নাজুক অবস্থায় বসে আছেন নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য। বন্দি জিয়াকে নিয়ে ভাববার সময় তখন তাদের নেই। সেনাবাহিনীতে এরপরে যিনি শক্ত অবস্থানে আছেন তিনি হচ্ছেন খালেদ মোশাররফ। কিন্তু পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে খালেদ মোশাররফই বন্দি করেছেন জিয়াকে। সুতরাং জিয়া টের পান সামরিক বাহিনীর ভেতর এমন কেউ নেই যিনি জিয়াকে মুক্ত করে আনবেন।

কিন্তু আর কেউ না জানলেও জিয়া জানেন যে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সবার অগোচরে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী আরো একটি দল, সেটি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। আর জিয়া ভালো করেই জানেন, এই সংস্থা চলছে একজন মানুষেরই নির্দেশে, তিনি কর্নেল তাহের। রণাঙ্গনে পরিচয় হয়েছে যার সঙ্গে, ঘনিষ্টতা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। জিয়া বরাবরই একধরণের অনিশ্চিত দূরত্ব থেকে সমর্থন দিয়ে গেছেন তাহেরকে। সুতরাং জিয়ার কাছে হিসেব পরিষ্কার যে ঐ মহাবিপদের সময় এই বিশ্ব সংসারে একজন মাত্র মানুষই আছেন যিনি রক্ষা করতে পারেন তাকে, তিনি হচ্ছেন কর্নেল তাহের। জিয়া তার শেষ বাজির তাসটি খেলেন। ঝুঁকি নিয়ে ভোররাতে ফোন করেন তাহেরকে যেখানে তার অনুরোধ সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্ট- ‘সেভ মাই লাইফ’।

২.
ঘটনা, দূর্ঘটনা, অতি ঘটনার এক আশ্চর্য সময় পার করছে তখন প্রিয় বাংলাদেশ। মুহূর্ত, ঘন্টা, দিনের মধ্যে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। যেন প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে নতুন এক একটি ইতিহাস।
প্রায় ভোররাতে জেনারেল জিয়ার টেলিফোন পাবার পর আর বিছানায় যাননি তাহের। ঘুম থেকে উঠে গেছেন লুৎফাও। তাহের বলেন, চা করো এক কাপ।
গভীর উদ্বিগ্নতায় চিন্তামগ্ন হয়ে বসে থাকেন তাহের। লুৎফা চা নিয়ে এলে কাপটা হাতে নিয়ে বলেন, ‘ক্যু, কাউন্টার ক্যু করে দেশটাকে ধ্বংস করে দিবে এরা। এবার আমাকে একটা অ্যাকশানে যেতেই হবে।’

সিপাইদের সংগঠিত করার জন্য সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন তাহের। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ সারাদেশের ক্যান্টনমেন্টসমূহে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকদেরকে জোরদার করছিলেন একটা অভ্যুত্থানের লক্ষ্যেই। ঘটনার এই অপ্রত্যাশিত মোড় আবারো একটা ক্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয় তাকে। সিপাইরা ছুটে আসছেন তাহেরের কাছেই। তারা এই অস্বাভাবিক অবস্থার পরিত্রান চান, নেতৃত্ব চান তাহেরের। তারা বিদ্রোহ করতে চান। কেউ খালেদ মোশাররফকে উৎখাত করতে চান। কেউ কেউ চান খালেদ, জিয়াসহ সব অফিসারদের হত্যা করতে। তাহের তাদের লাগামহীন উত্তেজনার রাশ টেনে ধরেন। তাদের বোঝান বিপ্লব মানেই হত্যা নয়। তবে এও বলেন যে, সময় এসেছে একটা চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবার এবং অচিরেই তারা তা নেবেন বলে সৈনিকদের জানান। কিন্তু সতর্কতার সাথে এগুতে হবে। শুধুমাত্র বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নয়, জাসদের সামগ্রিক অবস্থাটিও বিবেচনা করতে হবে।

যদিও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জাসদের একটি অঙ্গ সংগঠন, কিন্তু সে মুহূর্তে জাসদের মূল কর্মকান্ড আবর্তিত হচ্ছে তাদেরকে ঘিরেই। ফলে জাসদেকে তখন নিয়ন্ত্রন করছে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাই। আর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে আছেন তাহের। ফলে ঘটনা প্রবাহের গতি নির্ভর করছে তার সিদ্ধান্তের উপর। কিন্তু তাহের চান জাসদের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করতে।

জাসদের নেতৃবৃন্দের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর একটি অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিবে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, এরপর জাসদ তার গণবাহিনী এবং অন্যান্য সংগঠনসহ ছাত্র, শ্রমিক জনতাকে এই বিপ্লবে শামীল করা হবে। এটিই হবে সিপাহি জনতার বিপ্লব। (আজ বিএনপি পালন করেছে এই সিপাহী জনতার বিপ্লব দিবস। আহারে মালিকানা!)
এই অপারেশনে নেতৃত্ব দিবেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সুপ্রিম কমান্ডার কর্নেল তাহের।

এবং সিদ্ধান্ত হয় ৯ নভেম্বর সারাদেশে হরতাল ডাকা হবে। এই হরতালের মধ্য দিয়েই জাসদের অন্যান্য গণ সংগঠনগুলোকে চাঙ্গা করে মাঠে নামানো হবে এবং আসন্ন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করা হবে। তারপর পরিস্থিতি বুঝে ধার্য করা হবে বিপ্লবের নির্দিষ্ট দিন।

কিন্তু জাসদ পরিস্থিতি বোঝার আগেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মকান্ড সম্পর্কে অবহিত হয়ে যান খালেদ মোশাররফ। ফলে তিনি বিভিন্ন রেজিমেন্টের সিপাহীদের ঢাকা থেকে অন্যান্য জায়গায় বদলি করা শুরু করেন এবং নির্দেশ দেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতাদের খুঁজে বের করে বন্দি করতে।
এর ফলে সৈন্যদের মধ্যে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাহের সম্ভবত প্রস্তুত ছিলেন না এমন একটি পরিস্থিতির জন্য। তবুও তিনি সৈন্যদের শান্ত হতে বলেন। এবং পার্টির সাথে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন ৭ নভেম্বরই হবে চূড়ান্ত বিপ্লবের দিন।

তাহের এক এক করে অভ্যুত্থানের নির্দিষ্ট কর্মসূচি বর্ণনা করেন সিপাহীদের কাছে।
১.রাত বারোটায় ফাঁকা গুলি ছুঁড়েই বিপ্লবের সূচনা করা হবে।
২. জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন ছাড়া কাউকে গুলি করা যাবে না।
৩. খালেদ মোশাররফকে গ্রেপ্তার করা হবে।
৪. জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসা হবে তাহেরের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়। (**)
…………………………

৩.
আর দশটি রাতের মতোই আরো একটি রাত নামে ঢাকা শহরে। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত পেরোয়। সেদিন ৭ই নভেম্বর। শহরের উপর দিয়ে বয়ে যায় নভেম্বরের ঠান্ডা হাওয়া। মানুষ লেপের নিচে গা ঢাকে। অবশ্য তারা জানে না, সেই ১৮৫৭ সালের পর প্রায় দেড়শত বছর পেরিয়ে আর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে উপমহাদেশেহের দ্বিতীয় সিপাহী বিপ্লব।

জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করার দায়িত্ব ছিল হাবিলদার হাইয়ের উপর। তিনি ২০/৩০ জিন সিপাই নিয়ে জিয়ার বাসভবনে যান। তারা স্লোগান দিতে দিতে আসেন ‘কর্নেল তাহের লাল সালাম, জেনারেল জিয়া লাল সালাম’। ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি এমন যে কে কখন কাকে আক্রমন করবে, হত্যা করবে তার নিশ্চয়তা নেই। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ জিয়াকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন, এতগুলো সৈনিককে একসাথে স্লোগান দিয়ে আসতে দেখে তিনিও ভয় পেয়ে যান। দ্রুত সরে পড়েন সেখান থেকে। ফলে বিনা বাধায় হাবিলদার হাই পৌঁছে যান জিয়ার বাসভবনে। ঘরের ভিতর সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবী পড়ে বসে আছেন জেনারেল জিয়া। হাবিলদার হাই তাকে বলেন, কোন চিন্তা করবেন না স্যার, কর্নেল তাহের আমাদেরকে পাঠিয়েছেন আপনাকে তার কাছে নিয়ে যাবার জন্য।
গভীর রাতে টেলিফোনে অনুরোধের প্রেক্ষিতে তাহের যে বাস্তবিকই তাকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে তা দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠেন জিয়া। তিনি হাবিলদার হাইকে আলিঙ্গন করে বলেন, তাহের কোথায়?
হাই বলেন, কর্নেল তাহের এলিফ্যান্ট রোডে তার ভাইয়ের বাড়িতে আছেন। আপনাকে তার কাছে নিয়ে যেতে বলেছেন। খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন জিয়া। কিন্তু চারপাশে স্লোগানরত সৈনিক দেখে তিনি দ্রুত উঠে পড়েন গাড়িতে।

গাড়ি কিছুদূর এগুতেই সামনে প্রচন্ড গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পান তারা। সৈনিকরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না এটি তাদের পক্ষের নাকি বিপক্ষের। এসময় ফারুক রশিদের সহযোগী মেজর মহিউদ্দিন এসে জিয়াকে বলেন, খালেদ মোশাররফের দলের সৈন্যরা আক্রমন করার জন্য এগিয়ে আসছে, এখন ক্যান্টনমেন্টের বাহিরে যাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। জিয়াকে টু ফিল্ড আর্টিলারীতে নিয়ে যাবার ব্যাপারে মহিউদ্দিন খুব তৎপর হয়ে উঠেন। সিপাইরা খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা তাকে টু ফিল্ড আর্টিলারীতে নিয়ে আসেন। (বস্তুত, এটি ছিল মেজর মহিউদ্দিনের সাজানো নাটক, যাতে করে জিয়া ক্যান্টনমেন্টের বাহিরে যেতে না পারেন।) সেখানে পরিচিত আরো অনেক আতঙ্কিত অফিসারদের ভীড়ে জিয়া কিছুটা আত্নবিশ্বাস ফিরে পান। এবং এর ফলেই ইতিহাস মোড় নেই অন্যদিকে।

এদিকে এলিফ্যান্ট রোডে অধীর আগ্রহে তাহের অপেক্ষা করছেন কখন সৈন্যরা সেখানে নিয়ে আসবেন জিয়াকে। এরপর তারা শুরু করবেন অভ্যুত্থানের পরবর্তী পর্ব। কিছুক্ষণ পর হাবিলদার সিদ্দিক ট্র‍্যাক বোঝাই সিপাইদের নিয়ে হাজির হন এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়। উদগ্রীব তাহের ক্রাচে ভর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে তাদের জিজ্ঞাসা করেন, জিয়া কোথায়?
হাবিলদার সিদ্দিক বলেন, উনি আপনাকে টু ফিল্ড আর্টিলারীতে যেতে বলেছেন। ভীষণ ক্ষেপে যান তাহের। হাবিলদার বলেন, স্যার আমরা ভাবলাম, উনি তো আপনারই মানুষ, উনি যখন বললেন তখন আমাদের তাই করা উচিত।

জেনারেল জিয়ার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বাইরে না আসার এই ছোট্ট মোচড় বস্তুত বদলে দেয় বাংলাদেশের পরবর্তী ইতিহাস। জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যে দীর্ঘ প্রয়াস এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে যে সিপাহী জনতার বিপ্পব সবকিছুই তখন ধুলিস্যাত হওয়ার পথে।
তাহের দ্রুত ছুটেন ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে। পথে পথে বিপ্লবী সিপাইরা স্লোগান দেন কর্নেল তাহেরের নামে। তাহের সে মুহূর্তে জিয়ার অবস্থান নিয়ে উৎকণ্ঠিত।

টু ফিল্ড আর্টিলারীতে পৌঁছালে সৈনিক সংস্থার লোকেরা তাহেরকে কোলে করে ট্র‍্যাক থেকে নামান। তারা স্লোগান দেন ‘কর্নেল তাহের জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। জিয়া চেয়ার থেকে উঠে আসেন। কোলাকুলি করেন তাহেরের সঙ্গে। বলেন, ‘তাহের ইউ সেভড মাই লাইফ, থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’

জিয়া যতই তাহেরকে ধন্যবাদ জানান না কেন, তার পরিকল্পনামত জিয়া বাহিরে না যাওয়ায় তাহের খানিকটা বিরক্ত। তিনি জিয়ার সঙ্গে একান্ত আলাপ করতে চান। টু ফিল্ডের সিওর অফিসের পাশের ছোট্ট একটি রুমে গিয়ে বসেন জিয়া, তাহের, ইনু(বর্তমান তথ্যমন্ত্রী)।
তাহের বলেন, একটা ব্যাপারে আমাদের ক্লিয়ার থাকতে হবে যে পুরো বিপ্লবটা ঘটিয়েছে সিপাইরা। এখানে কোন একক পাওয়ার টেকওভাবের ব্যাপার নেই। আমরা এই মুহূর্তে জাসদের সরকার গঠন করতে চাচ্ছি না, আমরা জাতীয় সরকার করতে চাই। একটা অন্তর্বতীকালীন সরকার করতে চাই। আপাতত একটা যৌথ উদ্যোগ দরকার। আমাদের ইন্টারন্যাশনাল লিঙ্কেজের ব্যাপারেও ডিসিশান নিতে হবে। আপনি একটা ক্রসিয়াল রোল প্লে করতে পারেন। এসব নিয়ে আমাদের ডিটেইলে বসতে হবে। জিয়া চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে শুনেন।
তাহের বলতে থাকেন, তবে যেহেতু রাতের অন্ধকারে সিপাইরা বিদ্রোহ করেছে, দেশের সাধারণ মানুষ পুরো ব্যাপারটি নিয়ে অন্ধকারে থাকবে। কাজেই আমরা ঠিক করেছি আগামীকাল আমাদের প্রথম কাজ হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটা সমাবেশ করা। সেখানে বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণকে অভ্যুত্থানের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। আমি এবং আপনি সেখানে বক্তৃতা দেবো।

এবার নিরবতা ভেঙ্গে বেঁকে বসেন জিয়া। বলেন, ‘দ্যাখো তাহের, তোমাদের যা ইচ্ছে করো। আমি পলিটিশিয়ান না, আমাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে টানাটানি করো না।’
তাহের বলেন, না না, আমি একা বক্তৃতা দিলে তো হবে না। আপনিও তো পুরো ঘটনার একটা ইম্পর্ট্যান্ট পার্ট। দেশ একটা সংকটে এবং বিভ্রান্তির মধ্যে আছে। এ মুহূর্তে জনগণকে সুসংহত করা জরুরি।
জিয়া বলেন, আই এম নট গোয়িং আউট অব দিস ক্যান্টনমেন্ট।
তাহের বলেন, আপনি তাহলে কমিটমেন্ট ভঙ্গ করছেন। আপনি বলেছেন আমরা যেভাবে বলবো আপনি সেভাবেই কাজ করবেন।
জিয়া আবার বলেন, কিন্তু আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাবো না।

তাহের ক্রাচে ঠকঠক শব্দ তুলে অত্যান্ত রাগান্বিত এবং ক্ষুদ্ধ হয়ে ইনুকে নিয়ে বের হয়ে আসেন রুম থেকে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তাহের আবার জিয়াকে বলেন, আপনি তাহলে অন্তত রেডিওতে একটা বক্তব্য রাখেন। ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অফিসার বেষ্টিত জিয়া আবারো বলেন, তিনি ক্যান্টনমেন্টের বাহিরে যাবেন না।
তাহের টের পান হাত থেকে ফসকে গেছে স্বাদের মাছ।

তাহের তবুও চেষ্ঠা করেন জিয়াকে হাতের মুঠোয় আনতে। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজান জিয়াকে সামনে রেখেই। সিপাইদের মুখোমুখি হলে তাহের জিয়াকে বলেন কিছু বলতে। সাবধানী জিয়া খুব সংক্ষেপে বলেন, আমি রাজনীতি বুঝি না। ধৈর্য ধরেন। নিজের ইউনিটের শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। আপনাদের দাবীগুলো লিখিত দিন।
জিয়া যে ক্রমশ তার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছেন তা বেশ টের পান তাহের।
বস্তুত, জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বাহিরে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হওয়াতে অভ্যুত্থানের কেন্দ্র রয়ে গেছে ক্যান্টনমেন্টে। পরিকল্পনা মত জাসদ নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা তখন স্বচ্চ জলের মত পরিষ্কার।

তাহের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে। ওদিকে জিয়া নিজেকে নিয়ে গেছেন শক্ত অবস্থানে। তিনিও তার বিপদ আঁচ করতে পারেন। জানেন, তাহের সহজে হাল ছাড়বেন না। কিন্তু পরিস্থিতি এখন অনেকটায় তার দখলে। জিয়া জাসদ এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাকে দমন করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে থাকেন। শুরু হয় ব্যাপক গ্রেফতার।
হ্যাঁ, সেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা! যারা জিয়ার প্রাণ বাঁচিয়েছিল।

এবং আমরা দেখা পাই ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফরের।

৪.
৭ নভেম্বরের পর বেশ কিছুদিন নায়ায়ণগঞ্জের তাহেরের বাসা পুলিশ পাহারা দেয়। ২১ নভেম্বর লুৎফা হঠাৎ লক্ষ করেন পুলিশ পেট্রোল সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তাহের তখন ঢাকায় আত্নগোপন করে আছেন। তাহের ফোন করলে তাকে এখবর জানান লুৎফা। তাহের বলেন, সাবধানে থেকো।
ভয় পেয়ে যান লুৎফা। নিশ্চয় ওরা তাহেরকে হণ্যে হয়ে খুঁজছে।

ক্রোধ, আক্রোশ আর কিছুটা অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে যেন তাহেরকে। টের পেয়ে যান পরিস্থিতি তার জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। জানেন সম্ভবনা নেই বললেই চলে, তবু তাহের একবার চেষ্টা করেন জেনারেল জিয়ার সাথে আলাপ করার। যে লোকটির সঙ্গে তেলাঢোলার মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে বহুদিন চা খেতে খেতে গল্প করেছেন একসাথে, বাড়ির লনে বসে দেশের ভবিষ্যতের কথা আলাপ করেছেন, মাঝরাতে ফোন করে যে লোকটি তার কাছে জীবনরক্ষার অনুরোধ জানিয়েছেন, বন্দিদশা থেকে মুক্ত যে লোকটি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন ধন্যবাদ, তার সঙ্গে একবার সরাসরি কথা বলতে চান তাহের। টেলিফোন করেন বহুবার। কিন্তু বারবার তাকে বলা হয় তিনি ব্যস্ত আছেন, ফোন ধরতে পারবেন না। জেনারেল জিয়া তখন তাহেরের ধরাছোঁয়ার বাহিরে। তাহের টের পান জিয়া তখন আর কোন ব্যক্তি নন, জিয়া তখন একটি রাষ্ট্র। যেন তখন তিনি রাজকবরীর রাজা, অদৃশ্য কিন্তু ক্ষমতাধর। জিয়া তখন তার বিখ্যাত সানগ্লাস দিয়ে অদৃশ্য করে তার চোখ। তাহেরের জানবার উপায় নেই সানগ্লাস ঢাকা জিয়ার চোখে কি খেলা করছে তখন।

একদিন শুধু তাহের ফোন পান উপসেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের। তাহের ক্ষুদ্ধ হয়ে এরশাদকে বলেন, জিয়াকে বলবেন সে একটা বিশ্বাসঘাতক এবং আমি কখনোই আপোস করবো না। জাসদ লিডার আর আমার ভাই ইউসুফকে গ্রেপ্তার করার পরিণাম ভালো হবে না। তাকে বলবেন বিশ্বাসঘাতকতার পরিণাম তাকে ভোগ করতেই হবে।
কিন্তু জিয়া সানগ্লাসের ভেতরের কাচে ফুটিয়ে তোলেন ভিন্ন নীলনকশা।

২৩ নভেম্বর, সেদিন তাহের এবং তার ভাই আনোয়ার সোবহানবাগে তাদের ফুঁফুর বাসায় থাকেন। এখন তাদের যাযাবর জীবন। একদিন এক যায়গায় আত্নগোপন করে থাকেন। সকালে বের হয়ে যান আনোয়ার। বিকেল পাঁচটায় তাদের মিটিং। ভেবেছিলেন ফিরে এসে তাহেরকে নিয়ে একসঙ্গে যাবেন।
আনোয়ার এসে শুনেন তাহের বেরিয়ে গেছেন। আনোয়ার ছুটেন ঢাবির এম এম হলের উদ্দেশ্যে। হল গেটের কাছে পৌঁছাতেই দেখেন কয়েক ট্রাক পুলিশ হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। জানতে পারেন তাহেরসহ মিটিংয়ে উপস্থিত সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। তাহেরকে ধরিয়ে দেবার জন্য নানা ফাঁদ, কোশল এবং পুরষ্কারের ব্যবস্থা করেছে সেনাবাহিনী।

হতবিহ্বল হয়ে পড়েন আনোয়ার। তাহেরের গ্রেফতারে চরম হতাশ হয়ে পড়ে জাসদ এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকেরা।
জেল থেকে লুৎফাকে ফোন করেন তাহের। বলেন, ‘এরেস্ট হয়ে গেলাম। সাহস রেখো, চিন্তা করো না’

রাষ্ট্র পরিচিত হতে যায় ইতিহাসের ঘৃণ্য এক নীলনকশা বাস্তবায়নের সাথে।

৫.
শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম। ১৯৭৬ এর জুনে দেশের নানা জেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জাসদ এবং বিপ্লবী সংস্থার বন্দিদের একে একে আবার আনা হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। বিশেষ সামরিক আইন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। একে একে সবাইকে জড়ো করা হয়। নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাহের বুঝতে পারেন নিভৃতে, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। খুব গোপনে চলে বিচারিক কার্যক্রম। কোন সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি।

শুরু হয় বন্দীদের জবানবন্দী। সবচেয়ে দীর্ঘ জবানবন্দিটি দেন তাহের নিজেই। ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে তিনি বলতে শুরু করেন–
‘আপনাদের সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটি, যে মানুষটি আজ আদালতে অভিযুক্ত, সে একই মানুষ যে এই দেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য রক্ত দিয়েছিল, শরীরের ঘাম ঝরিয়েছিল, এমনকি নিজের জীবন পর্যন্ত পণ করেছিল। সেসব আজ ইতিহাসের অধ্যায়। ইতিহাস সেই মানুষটির কীর্তির মূল্যায়ন অতি অবশ্যই করবে। আমার সব কাজ, সব চিন্তায় আর স্বপ্নে এই দেশের কথা যেভাবে অনুভব করেছি সে কথা এখন এখানে দাঁড়িয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।
অথচ, ভাগ্যের কি নির্মিম পরিহাস! যে সরকারকে আমিই ক্ষমতায় বসিয়েছি, যে ব্যক্তিটিকে আমিই জীবন দান করেছি, তারাই আজ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আমার সামনে এসে হাজির হয়েছে। তারাই আজ আমার বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা করেছে, আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছে।
আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার সবই বিদ্বেষপ্রসূত, ভিত্তিহীন, ষড়যন্ত্রমূলক, সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি সম্পূর্ণ নিরাপরাধ।

এভাবেই ষড়যন্ত্র আর গোপনীয়তার মধ্য দিয়েই চলতে থাকে বিচার কার্যক্রম। খুব দ্রুতই চলে আসে রায়ের দিন।

১৭ জুলাই শনিবার। সব অভিযুক্তদের কাঠগড়ায় আনা হয়। রায় ঘোষণা হবে সেদিন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান কর্ণেল ইউসুফ হায়দার এসে বসলেন চেয়ারে। শুরু হলো রায় ঘোষণা পর্ব। কাউকে সাত বছর, কাউকে দশ বছর এবং নগদ টাকা জরিমান, কাউকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলেন। অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম এ জলিল এবং আবু ইউসুফের ব্যাপারে বলা হয় তাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তাদেরকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত।

ঐ ছোট্ট অস্থায়ী আদালতে তখন পিনপতন নীরবতা। শুধু একজনের রায় ঘোষণা বাকী রয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য সর্বোচ্চ বীরউত্তম খেতাবধারী, পঙ্গু এই মানুষটির জন্য কি শাস্তি নির্দিষ্ট করা আছে?
বিচারক ঘোষণা করলেন, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু তাহেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হল এবং তা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হবে। বিচারকের গলা যেন কিছুটা কাঁপলো।

স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন সবাই। তাকালেন তাহেরের দিকে। তাহের হাসছেন। পৃথিবীর ইতিহাসের এক বিরলতম হাসি।
তাহেরকে নেয়া হয় ফাঁসির আসামির জন্য নির্ধারিত ৮ নং সেলে। তার আগেই তাহের হাসিমুখে বিদায় নেন সবার কাছ থেকে।

অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মামলার রায়ের দাপ্তরিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রায় ঘোষণার মাত্র পাঁচ ঘন্টার মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মামলার সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে চলে যান বঙ্গভবনে।
১৮ জুলাই রাষ্ট্রপতি সায়েম, তাহেরের মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রেখে কাগজে সই করেন।

তাহেরের ফাঁসি ঠেকাতে তার পক্ষের আইনজীবীসহ অনেকেই চেষ্ঠা চালান। কিন্তু তাহের দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, এই বিস্বাসঘাতকের কাছে কোন অবস্থাতেই তিনি নত হবেন। তিনি প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করবেন না।

তাহেরেকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য জরুরি আপিল আসে অ্যামন্যাস্টি ইন্টারন্যাশনালের হেড অফিস থাকে, রাষ্ট্রপতি সায়েমকে টেলিগ্রাম লিখেন বর্ষীয়ান নেতা ভাসানী, লন্ডন বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেন তাহেরের শ্যালকসহ অন্য বাঙ্গালীরা। কিন্তু প্রাগৌতিহাসিক নীরবতায় ডুবে থাকে জিয়াউর রহমানের সরকার। শুরু হয় বহু বছর ধরে অকার্যকর, অব্যবহৃত ঢাকা জেলের ফাঁসির মঞ্চ সংস্কারের কাজ।

৬.
১৯ জুলাই প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে খবর এলো তাহেরের সঙ্গে দেখার করার। বলা হলো এখনিই যেতে হবে। দেখা করার সময় একঘন্টা। হঠাৎ করে ধক করে শব্দ উঠে লুৎফার বুকে। তড়িঘড়ি বেরিয়ে যান সবাই।

জেলের ভিতরে বাহিরে সবাই দেখা করে যাওয়ার পর রাত নামে ঢাকা জেলে। দু’জন দূত তাহেরকে এসে জানান, আগামীকাল ভোর চারটায় তার ফাঁসি কার্যকর হবে। তাহের তাদেরকে ধন্যবাদ জানান।

রাত তিনটায় তাহেরকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়। তাহের নিজেকে প্রস্তুত করেন। হাতের ক্রাচটি দেয়ালে হেলান দিয়ে রেখে নিজে নিজে তার নকল পা’টি পড়তে শুরু করেন। বিশেষ দিনগুলোতে তাহের ক্রাচ রেখে নকল পা’টি পড়েন। আজ তার বিশেষ দিন। এসময় কারারক্ষীরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলে তিনি বলেন, কেউ আমাকে স্পর্শ করবেন না। আমার শরীর নিষ্পাপ। আমি চাই না এই শরীরে আপনাদের কারো স্পর্শ লাগুক।

সুন্দর পরিপাটি হয়ে তাহের এগিয়ে যান ফাঁসির মঞ্চের দিকে। মঞ্চের কাছে গিয়ে তাহের সময় চেয়ে নিয়ে একটি কবিতা পড়েন। শ্রোতা কেবল জল্লাদ, জেলার, ডাক্তার, আর কয়েকজন কারাসাক্ষী। তাহের পড়েন:

‘জন্মেছি সারা দেশটাকে কাঁপিয়ে তুলতে
কাঁপিয়েই গেলাম।
জন্মেছি তাদের বুকে পদচিহ্ন আঁকবো বলে
এঁকেই গেলাম।
জন্মেছি মৃত্যুকে পরাজিত করবো বলে
করেই গেলাম।
জন্ম আর মৃত্যুর দুটি বিশাল পাথর
রেখে গেলাম।
সেই পাথরের নিচে শোষক আর শাসকের কবর দিলাম।
পৃথিবী অবশেষে এবারের মত বিদায় নিলাম’

তাহের ধীরেসুস্থে হেঁটে হেঁটে উঠে যান ফাঁসির মঞ্চে। স্তব্দ চারদিক। পরিচিত কাক ডেকে উঠে একটা দুটো। রুদ্ধশ্বাসে রাত জেগে বসে আছে কারাগারের শত শত কয়েদি। যাদের সেল ফাঁসির মঞ্চের কাছাকাছি তারা হঠাৎ ধরাস করে ফাঁসি কাঠের ডালা পড়ার শব্দ পান। ধড়মড়িয়ে উঠে ঘড়ি দেখেন বিশ সেলের মান্না, রাত তখন ৪টা ১ মিনিট।

তথ্যসুত্রঃ
১. ক্রাচের কর্নেল- শাহাদুজ্জামান
২. বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থান – কে এম শফিউল্লাহ
৩. http://www.col-taher.com/family.html.

What's Your Reaction?

লল লল
0
লল
আজাইরা আজাইরা
0
আজাইরা
চায়ের দাওয়াত চায়ের দাওয়াত
0
চায়ের দাওয়াত
জট্টিল মামা জট্টিল জট্টিল মামা জট্টিল
0
জট্টিল মামা জট্টিল
এ কেমন বিচার? এ কেমন বিচার?
0
এ কেমন বিচার?
কস্কি মমিন! কস্কি মমিন!
0
কস্কি মমিন!
কষ্ট পাইছি কষ্ট পাইছি
0
কষ্ট পাইছি
মাইরালা মাইরালা
0
মাইরালা
ভালবাসা নাও ভালবাসা নাও
0
ভালবাসা নাও

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিপ্লব এবং বিশ্বাসঘাতকতা

log in

Become a part of our community!

reset password

Back to
log in
Choose A Format
Personality quiz
Series of questions that intends to reveal something about the personality
Trivia quiz
Series of questions with right and wrong answers that intends to check knowledge
Poll
Voting to make decisions or determine opinions
Story
Formatted Text with Embeds and Visuals
List
The Classic Internet Listicles